তারাগঞ্জে মাদক চক্রের দৌরাত্ম্য, বাড়ছে অপরাধ

খুচরা কারবারিরা ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা, তরুণ সমাজ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, তারাগঞ্জ (রংপুর): রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকের বিস্তার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে খুচরা বিক্রেতা ও মাদক বহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থদাতা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অভিযান চললেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে উপজেলায় নতুন করে কয়েকটি মাদক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এসব চক্র আরও সংগঠিত হয়েছে বলে দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী এলাকা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে গাঁজা, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক তারাগঞ্জে প্রবেশ করছে। পরে গ্রামীণ সড়ক, হাট-বাজার ও আঞ্চলিক যোগাযোগপথ ব্যবহার করে দ্রুত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারিরা এখন মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্ধারিত স্থানে গোপনে মাদক সরবরাহ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আলমপুর ইউনিয়নের চিকলি ও খিয়ার জুম্মা, কুর্শা ইউনিয়নের জিগারতল ও অনন্তপুর, সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট ও চিলাপাক বাজার এবং ইকরচালী ইউনিয়নের বরাতি বাজার, বামনদিঘী ও বালাবাড়ি বাজারসহ একাধিক এলাকায় ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটের বেচাকেনা চলছে।
তাদের দাবি, নীলফামারী জেলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে। কোনো এলাকায় অভিযান শুরু হলে তারা দ্রুত পাশের এলাকায় সরে গিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মাদকের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলায় চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, পারিবারিক সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতার ঘটনাও বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এতে পরিবারে অশান্তি বাড়ছে এবং অভিভাবকদের উদ্বেগও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ভীমপুর কোরানীপাড়া এলাকায় নিখোঁজের একদিন পর নয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার এবং ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোরের মাদকাসক্তির অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে ওই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ শিক্ষক বলেন, “মাদক এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নেশার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত।”
তারাগঞ্জ বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আগে মাঝে মধ্যে মাদকের কথা শোনা যেত, এখন প্রায় প্রতিটি এলাকায় এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। চুরি-ছিনতাই বেড়েছে, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।”
এক শিক্ষার্থী বলেন, “বন্ধুদের প্রভাবে অনেক তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো জরুরি।”
সয়ার, আলমপুর ও ইকরচালী ইউনিয়নের কয়েকজন অভিভাবক জানান, ট্যাপেন্টাডল ও ইয়াবার সহজলভ্যতায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে না গিয়ে আড্ডা ও নেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, “মাদক নির্মূলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও মূল নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা জরুরি। অন্যথায় মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তারাগঞ্জের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।






