যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় স্বস্তি: আপত্তিতে অনড় ইসরায়েল

যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘিরে নতুন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত হয়েছে। উভয় পক্ষ ইতোমধ্যে নথিতে ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছে। সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
১৪ দফা সমঝোতায় কী আছে
ফাঁস হওয়া খসড়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধরত সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় ইরান, লেবানন ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালীতে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু করা।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল নিয়ে বিতর্ক
খসড়া নথিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য তহবিল গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র করদাতাদের অর্থ ইরানকে দিচ্ছে না। বরং সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তার মাধ্যমে এই অর্থায়ন হতে পারে। অর্থ ছাড় সম্পূর্ণভাবে ইরানের ভবিষ্যৎ আচরণ ও চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না—এ বিষয়টি সমঝোতার মধ্যে “অন্তর্নির্মিত সুরক্ষা ব্যবস্থা” হিসেবে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
তেলের বাজারে স্বস্তি
সমঝোতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল হলে ইরানের তেল রপ্তানি বাড়বে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
সর্বশেষ লেনদেনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
ইসরায়েলের আপত্তি
চুক্তিকে স্বাগত জানালেও ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকির ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এ সমঝোতার বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে।
ইসরায়েলি নেতারা জানিয়েছেন, এই সমঝোতা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। লেবাননে অবস্থানরত বাহিনী প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযানও অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও কাতার
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা এ সমঝোতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করলেও এটি এখনো একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা সফল না হলে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ—এসব প্রশ্নের সমাধানের ওপরই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা।






