রাজশাহীতে কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে অবৈধ পুকুর: হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

পুকুরের সংখ্যা বেড়েছে: ২০১৫ সালে ৪০,৭৮৮টি → ২০২৫ সালে ৫১,২৭৫টি (প্রায় ২৫-২৮% বৃদ্ধি)। অনেক অবৈধ পুকুর নিবন্ধিত নয়।
২০২০-২০২৫ সালে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৫,২৮৯ একর। পুঠিয়া-দুর্গাপুর-বাগমারায় থামছে না খনন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলায় তিন ফসলি উর্বর কৃষিজমিতে অবৈধ পুকুর খননের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অধিক মুনাফার আশায় প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কৃষিজমি কেটে পুকুরে রূপান্তর করছে। এতে একদিকে আবাদযোগ্য জমি কমছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর কৃষিজমি কমে গেছে। এর বড় একটি অংশ হারিয়ে গেছে পুকুর খননের কারণে। একই সময়ে জেলার পুকুরের সংখ্যা ৪০ হাজার ৭৮৮ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫১ হাজার ২৭৫টিতে পৌঁছেছে। অনেক পুকুরের সরকারি নিবন্ধনও নেই।
পুঠিয়ায় রাতের আঁধারে খনন
পুঠিয়া উপজেলার জিউপাড়া, ভালুকগাছি, শিলমাড়িয়া ও বেলপুকুর এলাকায় এখনও অবৈধভাবে পুকুর খনন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অধিকাংশ খননকাজ রাতের আঁধারে পরিচালিত হয় এবং কাটা মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে একাধিক স্থানে জরিমানা করা হয়েছে এবং খননযন্ত্র অকেজো করা হয়েছে। উপজেলার মোট ৯ হাজার ৬২৯ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮৩০ হেক্টর এলাকায় ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৭৬২টি পুকুর গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার কারণে হাজার বিঘা জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে।
দুর্গাপুরে কৃষকদের প্রতিরোধ
দুর্গাপুর উপজেলার উজানখলসী, মাড়িয়া, জয়নগর, কিসমত গণকৈড় ও সুখানদিঘি এলাকায়ও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে এক মাসে ১১টি অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং একাধিক ভেকু মেশিন নিষ্ক্রিয় করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় ক্ষুব্ধ কৃষকরা অবৈধ খননে ব্যবহৃত ভেকুতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে খনন বন্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাগমারায় স্থগিতাদেশ উপেক্ষা
বাগমারা উপজেলার নিমাই বিল, গণিপুর, আউসপাড়া, গোয়ালকান্দি, শুভডাঙ্গা, ঝিকরা ও বিহানালী ইউনিয়নে অবৈধ পুকুর খনন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
জানুয়ারি থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে ভেকু মেশিন জব্দ ও অকেজো করা হয়েছে। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও কিছু এলাকায় এখনও খনন অব্যাহত রয়েছে।
তাদের দাবি, প্রভাবশালী চক্র অনেক সময় কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জমি দখল করে পুকুর খনন করছে। এর ফলে ধানক্ষেতে পানি জমে কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
মুনাফার লোভে কৃষিজমি ধ্বংস
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ চাষে কৃষিকাজের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি লাভ হওয়ায় অনেক জমির মালিক পুকুর খননে আগ্রহী হচ্ছেন। এছাড়া খননকৃত মাটি বিক্রি করেও বড় অঙ্কের অর্থ আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ধান, পাট, আখ ও আমবাগানের পরিমাণ কমছে। ভারী যানবাহনের চলাচলে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের মাধ্যমে ট্রাক্টর পরিচালনার ঘটনাও বাড়ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম খাদ্য উৎপাদনকারী এলাকা রাজশাহীর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে।
কঠোর নজরদারির দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের দাবি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সরকারি অনুমোদন ছাড়া পুকুর খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কৃষি বিভাগের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






