বগুড়ায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ

সিটি কর্পোরেশনের পর পরিকল্পিত নগরায়ণে নতুন আইন, থাকছে ভবন অনুমোদন থেকে জলাশয় রক্ষার ক্ষমতা
টুইট ডেস্ক: বগুড়া শহর ও আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিত আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। খসড়ায় বগুড়া সিটি কর্পোরেশন এলাকা এবং সরকার নির্ধারিত সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে নতুন কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের দাবির পর সম্প্রতি বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়। গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরে ৭ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম বৈঠকে সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ১৪ মে দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হিসেবে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দ্রুত নগরায়ণের ফলে বগুড়ায় অবকাঠামোগত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ সহনশীল নগরব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, সরকার প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আইন কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করবে। আইন কার্যকর হলে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হবে।
১৭ সদস্যের কর্তৃপক্ষ
খসড়া অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এতে সরকারের প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত চারজন সদস্য ছাড়াও বগুড়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, গণপূর্ত ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে থাকবেন। একজন নির্বাহী পরিচালক সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব অথবা সরকার মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সদস্যদেরও সরকার নিয়োগ দেবে।
নগর পরিকল্পনা থেকে ভবন অনুমোদন
খসড়া আইনে কর্তৃপক্ষকে নগর উন্নয়ন, পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহাপরিকল্পনা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন, ভূমি জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
এ ছাড়া ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ, ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং আবাসন খাতে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও থাকবে এই কর্তৃপক্ষের হাতে।
সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন, অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বয় এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও পালন করবে সংস্থাটি।
জলাশয় ও কৃষিজমি রক্ষায় গুরুত্ব
খসড়ায় পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, জলাশয়, কৃষিজমি, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও উদ্যান সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বনায়ন ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিক বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বিস্তৃত হওয়া বগুড়া শহরে এখনই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সে বিবেচনায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।
আইনের লঙ্ঘনে জেল-জরিমানার বিধান
খসড়া আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
মহাপরিকল্পনায় নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ভূমি ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিচু জমি ভরাট, প্রাকৃতিক জলাধারের পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি কিংবা নদ-নদী, খাল-বিল ও পুকুরের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করলে প্রথমবার সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
এ ছাড়া অনুমোদিত নকশার বাইরে স্থাপনা নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আদলে বগুড়াতেও পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে নগর সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও জানান, খসড়া আইনটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অংশীজনদের মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।






