কাবার কিসওয়া: ইতিহাস, তাৎপর্য ও ঐতিহ্য

কালো আবরণে জড়িয়ে আছে সম্মান, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা
পবিত্র কাবা শরিফ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত স্থান। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালনে লাখো মুসল্লি কাবা শরিফ তওয়াফ করেন। এই কাবা শরিফ সবসময় একটি বিশেষ কালো কাপড়ে আবৃত থাকে, যাকে বলা হয় ‘কিসওয়া’। সোনালি সুতা দিয়ে বোনা পবিত্র কোরআনের আয়াতে সজ্জিত এই আবরণ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি কাবার মর্যাদা, সম্মান ও সুরক্ষারও বহিঃপ্রকাশ।
কিসওয়ার ইতিহাস বহু প্রাচীন
ঐতিহাসিকদের মতে, কাবা ঢাকার প্রথা ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই প্রচলিত। ধারণা করা হয়, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আস’আদ কামিল খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে প্রথম কাবা শরিফ কাপড়ে আবৃত করেন। তবে আরেকটি মত অনুযায়ী, হজরত ইসমাইল (আ.) কাবার একটি অংশ আবৃত করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উসমানী যুগের গবেষক ও ‘এ গাইড থ্রু মক্কা আল-মুকাররমা’ গ্রন্থের লেখক মেনসুদ দুলোভিচ উল্লেখ করেন, প্রাচীন যুগে কাবার আবরণ হয়তো পুরো স্থাপনাকে নয়, বরং নির্দিষ্ট অংশকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিসওয়া কী
‘কিসওয়া’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ আবরণ, ঢাকা বা পোশাক। সময়ের পরিক্রমায় শব্দটি বিশেষভাবে কাবা শরিফের আবরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ‘গিলাফ’ নামেও পরিচিত। ফার্সি ‘গিলাফ’ শব্দের অর্থও আবরণ বা পর্দা।
কোথায় তৈরি হতো কিসওয়া
ইসলামের প্রাথমিক যুগে কিসওয়া তৈরি হতো মিসরে। বিশেষ করে দামিয়েত্তা অঞ্চলের রাজকীয় ‘তিরাজ’ কারখানায় উন্নত মানের কাপড় বোনা হতো। পরবর্তীতে সৌদি আরবেই আধুনিক প্রযুক্তিতে কিসওয়া তৈরির ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
বর্তমানে কিসওয়া প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি করা হয়। এতে সোনালি ও রুপালি সুতা দিয়ে কোরআনের আয়াত অঙ্কিত থাকে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে লিনেন, তুলা, পশম এমনকি চামড়াও কাবার আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
কেন ওপরে তুলে রাখা হয় কিসওয়ার নিচের অংশ
হজের মৌসুমে কিসওয়ার নিচের অংশ কিছুটা ওপরে তুলে রাখা হয়। কারণ, বিপুলসংখ্যক হাজি কাবা স্পর্শের চেষ্টা করেন। এতে কাপড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কিসওয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রতীক
কিসওয়া মুসলিম উম্মাহর কাছে শুধু একটি কাপড় নয়; এটি ইসলামের ঐতিহ্য, শ্রদ্ধা ও ঐক্যের প্রতীক। প্রতি বছর নতুন কিসওয়া পরানো হয়, যা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে বিবেচিত।






