ডাকঘরে পাঁচ দশকের বৈষম্য: ২৩ হাজার কর্মী মানবিক সংকটে

২৩ হাজার কর্মীর ন্যায্যতার লড়াই। ৯ দফা দাবিতে ইডি ডাক কর্মচারীদের আমরণ অনশনের ঘোষণা।

টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশ শাখা ডাকঘর কর্মচারী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অবিভাগীয় (ইডি) ডাক কর্মচারীরা ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। দাবি পূরণ না হলে আগামী ৮ জুন ২০২৬ থেকে ডাক অধিদপ্তরের সামনে কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা বলেন, বর্তমানে দেশের ৮ হাজার ৫৩৪টি অবিভাগীয় ডাকঘরে প্রায় ২৩ হাজার ২১ জন ইডি কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা স্বল্প ভাতায় ডাক বিভাগের বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসলেও তাঁদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়নি।

গড়ে ‍শিশুসহ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষ এই আয়-নির্ভর জীবনের সঙ্গে যুক্ত।

বক্তারা জানান, বর্তমানে একজন ইডি কর্মচারীর মাসিক ভাতা মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ৮৪১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে এ আয় দিয়ে পরিবার পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের পর গত প্রায় আট বছরেও তাঁদের ভাতা বৃদ্ধি করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ইডি কর্মচারীরা বিভাগীয় কর্মচারীদের মতো একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও তাঁরা কোনো উৎসব ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কিংবা অবসরকালীন সুবিধা পান না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।

সংগঠনের নেতারা জানান, এর আগে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। সে সময় ডাক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান আন্দোলন

ইডি ব্যবস্থার সূচনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। গ্রামীণ এলাকায় স্বল্প ব্যয়ে ডাকসেবা বিস্তারের জন্য স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করা হতো। স্বাধীনতার পরও এই কাঠামো বহাল থাকে।

১৯৭৩ সালে ভাতা ছিল মাত্র পঁয়ত্রিশ টাকা। একই বছরের মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সময় আন্দোলনের পর ভাতা বাড়িয়ে পঁচাত্তর টাকা করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের পর এই অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ইডি ডাক কর্মচারীরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০১৬ সালে শতভাগ এবং ২০১৮ সালে ৭৭ শতাংশ ভাতা বৃদ্ধি করা হয়। তবে এরপর দীর্ঘ সময় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

বেতন কাঠামো ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ

ইডি কর্মচারীরা পূর্ণাঙ্গ সরকারি কর্মচারী নন। তাঁরা আংশিক সময় বা কমিশনভিত্তিক ব্যবস্থায় কাজ করেন। বর্তমানে মাসিক ভাতা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ৮৪১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কমিশনসহ মোট আয় সাধারণত ৮ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।

অন্যদিকে দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় এখন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি।

ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। অনেক কর্মচারী ঋণ করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

উত্থাপিত ৯ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলো হলো, এজেন্ট প্রথা বিলুপ্ত করে পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি প্রদান; স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালু; ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণ; উৎসব ভাতা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান; অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা; সরাসরি নিয়োগ ব্যবস্থা চালু; কল্যাণ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধি; শ্রম আইন অনুযায়ী বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন; অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধি।

ইডি কর্মচারী নেতারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী ৮ জুন ২০২৬ থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করা হবে। প্রয়োজনে সারাদেশের ইডি অফিসসহ সকল পোস্ট অফিস বন্ধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

মানবিক সংকট ও সেবার প্রভাব

এই কর্মীরা গ্রামীণ এলাকায় চিঠি, মানি অর্ডার ও ডাকসেবা পৌঁছে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। প্রায় এক লক্ষ মানুষ সরাসরি এই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিবারের মাধ্যমে জড়িত এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের অবহেলা শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং দেশের ডাকসেবার টেকসই ভবিষ্যতের জন্যও বড় ধরনের হুমকি।

ইডি (অবিভাগীয়) ডাক কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি কেবল আর্থিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বড় মানবিক বাস্তবতা, যা সরাসরি তাঁদের পরিবার ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বর্তমানে প্রায় ২৩ হাজার ইডি কর্মচারী সীমিত ভাতায় দায়িত্ব পালন করছেন। গড়ে ‍শিশুসহ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষ এই আয়-নির্ভর জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এই পরিবারের বেশিরভাগই গ্রামীণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যেখানে আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি।

এই পরিবারের শিশুদের শিক্ষা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক কিংবা কোচিংয়ের খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শিশুদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রজন্মকে পিছিয়ে দেয়।

একইভাবে পরিবারের বয়স্ক বাবা-মা ও নির্ভরশীল সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সাধারণ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা অনেক সময় অনিয়মিত হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে পরিবারগুলো শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম দুর্দশার মধ্যে পড়ে।

স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কেও আর্থিক চাপের কারণে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, বাড়িভাড়া, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পারায় অনেক পরিবারে উদ্বেগ, চাপ ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি সামাজিক ও মানসিক সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে বেতন ও ভাতা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হলে শুধু আয় বাড়বে না, বরং পরিবারগুলোর শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত হবে, বয়স্কদের চিকিৎসা সহজ হবে এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। এতে একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবনে মানবিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা তৈরি হবে, যা রাষ্ট্রীয় সেবার মানোন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।