কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিক্ষোভের মুখে গভর্নর আহসান মনসুরের বিদায়

কর্মকর্তাদের আল্টিমেটাম, সংবাদ সম্মেলন ও আকস্মিক নতুন নিয়োগের ঘোষণায় উত্তপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংক; উপদেষ্টাকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা, বাড়তি পুলিশ মোতায়েন।
টুইট প্রতিবেদক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টানা উত্তেজনা, কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ ও আল্টিমেটামের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত পদ ছাড়তে হলো আহসান এইচ মনসুর-কে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে অফিস ত্যাগের পরপরই সরকার তাঁর নিয়োগ বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়। নতুন নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ ব্যাংক-এর প্রধান কার্যালয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সকাল থেকেই বিক্ষোভ, আল্টিমেটাম
সকাল ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল-এর ব্যানারে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ বাতিল, বদলি প্রত্যাহার এবং অন্যান্য দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সভা থেকে গভর্নরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়—দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহস্পতিবার থেকে প্রতীকী কলমবিরতি পালন করা হবে।
প্রতিবাদ সমাবেশে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানও দিতে দেখা যায় কিছু কর্মকর্তাকে।
অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, গভর্নর একতরফা ও ‘স্বৈরাচারী’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শোকজের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি আদেশ জারি করা হয়েছে এবং আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মুখপাত্রদের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন।” তিনি অভিযোগ করেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ানো, উপদেষ্টা নিয়োগের বিস্তার এবং ব্যাংক খাত নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে।
নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউর উপপ্রধান মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, গত কয়েক মাস ধরে ন্যায্য দাবি জানানো হলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় সংলাপের আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের অবস্থান
বেলা ২টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে আহসান এইচ মনসুর বিক্ষোভকে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ, রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় কোনো কর্মচারী সংগঠনের আলোচ্য হতে পারে না।
দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর লক্ষ্য ৭৬ লাখ আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করা, যারা দীর্ঘদিন অর্থ উত্তোলনে সমস্যায় ছিলেন। একটি ‘কুচক্রী মহল’ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পদত্যাগের দাবির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমি চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে সিদ্ধান্ত হবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়।”
নতুন গভর্নর নিয়োগ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত
সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণের মধ্যেই গণমাধ্যমে নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর আসে। এরপর বেলা ২টার দিকে আহসান এইচ মনসুর অফিস ত্যাগ করেন। বের হওয়ার সময় তিনি জানান, তিনি পদত্যাগ করেননি; টেলিভিশনে নতুন নিয়োগের খবর দেখেই অফিস ছাড়ছেন।
উপদেষ্টাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ
গভর্নর বেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে হট্টগোল শুরু হয়। কর্মকর্তাদের একাংশ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ-কে কার্যালয় থেকে বের করে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়িতে তোলার সময় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ সময় অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম-কে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে দেখা যায়। উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
একীভূতকরণ ও শোকজ বিতর্ক
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স উদ্যোগসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলন করেন কর্মকর্তারা। এর জেরে তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয় এবং পরদিন ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
তবে বুধবার নতুন গভর্নর নিয়োগের খবরে মানবসম্পদ বিভাগ তিন কর্মকর্তার বদলি আদেশ প্রত্যাহার করে নিজ নিজ বিভাগে পুনর্বহাল করে।
সংকেত কী?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য বিক্ষোভ, শীর্ষ কর্মকর্তার আকস্মিক বিদায় এবং একই দিনে নতুন নিয়োগ। দেশের আর্থিক খাতে অনিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক একীভূতকরণ, আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন-এই তিন ইস্যুই এখন সামনে এসেছে নতুন গভর্নরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এই দুই পরীক্ষায় নতুন নেতৃত্ব কত দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।






