যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় আবারও ভারত-তুরস্ক

ভারতীয় দম্পতি ও তাঁদের সংশ্লিষ্ট ৯ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘শ্যাডো ফ্লিটে’ জাল পতাকা-সনদ সরবরাহের অভিযোগ; ইরানি উড়োজাহাজ সংস্থাকে সেবা দেওয়ায় তুরস্কের ফুগো গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের ওপরও নিষেধাজ্ঞা
নিজস্ব প্রতিবেদক: ইরানের তেল পরিবহন ও বিমান চলাচল খাতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সহযোগিতার অভিযোগে ভারত ও তুরস্কভিত্তিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ বিভাগের ৪ নভেম্বরের ঘোষণায় ভারতের এক দম্পতি, তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই নাগরিক এবং নয়টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত বিমান সংস্থাগুলোকে সেবা দেওয়ার অভিযোগে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয় এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ ও পণ্য পরিবহনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করাই এ অভিযানের লক্ষ্য।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, স্থল, জল কিংবা আকাশপথ—যে মাধ্যমেই হোক, ইরান সরকারকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ভারতীয় দম্পতির বিরুদ্ধে সামুদ্রিক জালিয়াতির অভিযোগ
মার্কিন অর্থ বিভাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ভারতভিত্তিক সুনীল কুমার শর্মা ও তাঁর স্ত্রী জাসপ্রিত প্রীতি শহিদ। তাঁদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত আরও দুই ভারতীয় নাগরিক অশ্বানি কুমার ধিমান ও ইশ্বিন্দর সিংকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া শর্মা ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়টি প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্ক ইরানের তেল পরিবহনে ব্যবহৃত নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজগুলোকে ভুয়া পতাকা ও জাল সামুদ্রিক সনদ সরবরাহ করত। এর মাধ্যমে জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলাচলের সুযোগ পেত।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের দাবি, শর্মা ও তাঁর স্ত্রী বিভিন্ন দেশের অনুমোদিত সামুদ্রিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া নিবন্ধন ও সনদ প্রদানকারী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে গায়ানা, এসওয়াতিনি ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, ভুয়া পতাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোর বৈধ সুরক্ষা ও দায়বদ্ধতা বিমা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দেশের উপকূলীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তুরস্কের বিমান চলাচল খাতেও নিষেধাজ্ঞা
ইরানের বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতার অভিযোগে তুরস্কভিত্তিক ‘ফুগো গ্রাউন্ড সার্ভিসেস ইনকরপোরেশন’ (Fugo Ground Services Inc.)-কে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থ বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত কয়েকটি বিমান সংস্থাকে বিমানবন্দরের ভূমিসেবা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছিল। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে ইরান এয়ার ট্যুর, সাহা এয়ারলাইনস, সেপেহরান এয়ারলাইনস, ভারেশ এয়ারলাইনস, তাবান এয়ার এবং আতা এয়ারলাইনস। নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে সেবা দেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন অর্থ বিভাগের ঘোষণা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত অথবা মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ ও সম্পদসংশ্লিষ্ট স্বার্থ জব্দ থাকবে। এসব সম্পদের বিষয়ে মার্কিন অর্থ বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে (ওএফএসি) জানাতে হবে।
এ ছাড়া মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিকাংশ ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ওএফএসি অনুমোদিত সাধারণ বা বিশেষ লাইসেন্স কিংবা প্রযোজ্য অব্যাহতির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এককভাবে কিংবা সম্মিলিতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মালিক হলে সেই প্রতিষ্ঠানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে মার্কিন ও বিদেশি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মার্কিন অর্থ বিভাগের দাবি, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর মাধ্যমে ইরানের তেল পাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। গত ৪ নভেম্বরের ঘোষণায় ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরানের অর্থনৈতিক আয়ের উৎস বন্ধ করতে দেশটির সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞা ফাঁকিতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থ বিভাগ এর আগে দাবি করেছে, নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমেছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে এসব পরিসংখ্যান মার্কিন অর্থ বিভাগের মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, তেল পরিবহন, সামুদ্রিক নিবন্ধন, বিমানবন্দর সেবা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের মধ্যস্থতাকারীদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ, রয়টার্স।






