২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এইচএসসি পাসের হার

পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, জিপিএ-৫ কমেছে ৩২ হাজারের বেশি।
টুইট প্রতিবেদক: ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
রোববার (১ নভেম্বর) প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছর পুনর্নিরীক্ষণের পর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৭২ হাজার ১৭৬ জন। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ৩২ হাজার ৯২টি।
ইংরেজি ও আইসিটিতে বড় বিপর্যয়
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ফেল করেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি। ঢাকা বোর্ডে এ হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে ইংরেজিতে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইংরেজি ও আইসিটির দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট এবং প্রশ্নপত্রের ধরনও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পাসের হারে এগিয়ে ছাত্রীরা
ফলাফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এবার ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
তবে জিপিএ-৫ অর্জনে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ছাত্ররা। মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন।
বোর্ডভিত্তিক ফলে শীর্ষে ঢাকা
১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ ছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এবার প্রথমবারের মতো নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এরপরও বোর্ডভেদে ফলাফলে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে।
২৯৩ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এবার দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
অন্যদিকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার মাত্র ১৩৯টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের এমন বৈষম্য শিক্ষকসংকট, পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ
এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব শিক্ষার্থী শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। তবে পরীক্ষার সময়সূচি ও ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির সুযোগ পাবে না। আবার বেশি দেরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সময় নির্ধারণ করা হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন
এবারের ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের ভুল, পরীক্ষা গ্রহণে অব্যবস্থাপনা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম পত্রে দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণে অসংগতির অভিযোগও ওঠে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ফলাফলের এই ধারাবাহিক অবনতি কেবল পাস-ফেলের পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের শিক্ষার গুণগত মানের জন্য সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, মৌলিক বিষয়ে তাদের দক্ষতা কতটা বাড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান কেমন, এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে এবারের এইচএসসি ফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।






