সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতের আহ্বান

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন নিশ্চিতে সরকারি উদ্যোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ; জলাধার, সবুজ এলাকা ও নাগরিক সুবিধা সংরক্ষণের দাবি বিশেষজ্ঞদের।

টুইট প্রতিবেদক: সবার জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আবাসন মানে শুধু মাথা গোঁজার জায়গা নয়; নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলার মাঠ ও সবুজ উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করাও একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার অপরিহার্য শর্ত।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ‘বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিতে সবার জন্য মানসম্মত আবাসন’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট আয়োজিত সভায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনসংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী। সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুন।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, আবাসন খাতকে অনেকাংশে আবাসন ব্যবসার ওপর ছেড়ে দেওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু ঘর নির্মাণ করলেই আবাসনের চাহিদা পূরণ হয় না; এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে সুস্পষ্ট আবাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি জমি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে জমি, অর্থায়ন, নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

বড় বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে অন্তত ২০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার মতো নীতি বিবেচনারও পরামর্শ দেন তিনি।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জনগণের অর্থে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রকল্পের কারণে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্য এবং জলাধার ও সবুজ এলাকা ধ্বংসের ফলে নগরের পরিবেশ ও বাসযোগ্যতা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, নগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো জলাধার ও সবুজ এলাকার সংকোচন। তাই নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জলাধার, সবুজ অঞ্চল ও উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ করতে হবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবুজায়ন ও প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উন্মুক্ত স্থানে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। জিয়া উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান ও ওসমানী উদ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থানে কংক্রিটের পরিমাণ না বাড়িয়ে সবুজায়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সরকার, সিটি করপোরেশন, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ভূমিজের প্রতিষ্ঠাতা ফারহানা রশীদ তনু বলেন, বাংলাদেশে ২০১৬-২০১৭ সাল থেকে গণশৌচাগার ও স্যানিটেশন নিয়ে কাজ এবং আন্দোলন গতি পেলেও এ খাতে এখনো সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। শুধু শৌচাগার নির্মাণ নয়, এর অবকাঠামো, ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থায়ন—সব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে গাউস পিয়ারী বলেন, নগরকে প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য করতে নাগরিকদের দাবি ও মতামত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানো প্রয়োজন। প্রতিটি নাগরিকের হাঁটা ও খেলাধুলার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সাধারণ মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সমাজের সব মানুষের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচল এবং পার্ক ও খেলার মাঠ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি পথচারীদের অধিকারসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

বক্তারা মনে করেন, সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নাগরিক সুবিধা এবং মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকারকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সরকার ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং জনবান্ধব নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব।