চীনা বিনিয়োগে পাকিস্তানে ২২৫ কোটি ডলারে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কারখানা, চুক্তি স্বাক্ষর

রাওয়ালপিন্ডিতে চীনা ও স্থানীয় বিনিয়োগে প্রকল্প; বছরে উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, ২০৩০ সালে চাহিদা ১ লাখ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর পূর্বাভাস।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানের সামরিক মালিকানাধীন মার্গালা হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (এমএইচআইএল) চীনা অংশীদার ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ২২৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের চুক্তি করেছে। রাওয়ালপিন্ডি জেলার হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ট্যাক্সিলায় স্থাপিতব্য এ কারখানাকে দেশের প্রথম বড় আকারের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) পাকিস্তানের ইঞ্জিনিয়ারিং ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (ইডিবি) প্রধান নির্বাহী হাম্মাদ আলী মনসুর এ তথ্য জানান।

আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। কারখানার ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তবে সরকারের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনবিষয়ক নীতিমালা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি। নীতিমালা অনুমোদিত হলে ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন মনসুর।

তিনি বলেন, চীনের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে গত জুলাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। কারখানাটিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ব্যাটারি সেল উৎপাদন করা হবে। পরে বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০৩০ সালে চাহিদা ১ লাখ মেগাওয়াট

পাকিস্তানের ইডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন বৈদ্যুতিক যানবাহনভিত্তিক অটোমোবাইল নীতিমালা কার্যকর হলে ২০৩০ সালের জুন নাগাদ দেশটিতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের (বিইএসএস) চাহিদা ১ লাখ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। তবে এ চাহিদা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে চাহিদা ১ লাখ মেগাওয়াট এবং প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের কম হলে তা ৮০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ইডিবির প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন।

ইডিবির হিসাব অনুযায়ী, শুধু বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট ব্যাটারি সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। সম্ভাব্য চাহিদা পূরণে চার থেকে পাঁচটি বৃহৎ ব্যাটারি কারখানা স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি কারখানায় আনুমানিক ১০০ কোটি থেকে ১২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

পরিবার, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা এবং দুই চাকার যান, তিন চাকার যান, গাড়ি, বাস ও ট্রাকসহ বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে ব্যাটারির চাহিদা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

জ্বালানি আমদানি কমানোর লক্ষ্য

পেট্রলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে চায় পাকিস্তান। পাশাপাশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাটারির চাহিদা বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে ব্যাটারি সেল উৎপাদন শুরু হলে আমদানিনির্ভরতা কমানো, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে পাকিস্তানে ব্যাটারি, মোটর, নিয়ন্ত্রক যন্ত্র ও চার্জারের মতো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়। ইডিবির হিসাবে, দেশটিতে বছরে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ব্যাটারি সংযোজন করা হয়। এসব যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

আরও তিন শহরে কারখানার পরিকল্পনা

রাওয়ালপিন্ডির প্রকল্পের পাশাপাশি লাহোর, ফয়সালাবাদ ও করাচিতে আরও ব্যাটারি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের সাইগোল গ্রুপ ও চীনের জুহাং এনার্জি টেকনোলজি গ্রুপের মধ্যে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কোহিনূর এনার্জিসহ অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও চীনা অংশীদারদের সঙ্গে ব্যাটারি সংযোজন ও উৎপাদন নিয়ে আলোচনা করছে।

সরকার লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য বিশেষ নীতিমালা প্রস্তুত করেছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় কর ও শুল্কসুবিধা এবং উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ রপ্তানির শর্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এমএইচআইএল বর্তমানে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের পাশাপাশি কমপ্যাক্ট ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, বৈদ্যুতিক বাস ও দুই চাকার বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন করে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের ব্যাটারি সেল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং বৈদ্যুতিক যান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও এগিয়ে যাবে।

সূত্র: আরব নিউজ, ২৬ অক্টোবর ২০২৬