জ্বালানি সংকটে চাপে পোশাক শিল্প, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি ও ডিজেলের বাড়তি দামে সংকটে রপ্তানি খাত; প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চাপে কারখানাগুলো
টুইট প্রতিবেদক: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাড়তি চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ সামলাতে হচ্ছে উৎপাদকদের।
মার্কিন সাময়িকী টাইমের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের সম্ভাবনাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলনির্ভরতা
ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে বিকল্প হিসেবে চালু করতে হয় ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন সচল রাখতে এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
হা-মীম গ্রুপের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব বিভাগের প্রধান তানুল চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাসের পর ডিজেলই অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিন্তু ডিজেলের উচ্চমূল্য উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হা-মীম গ্রুপের দৈনিক জ্বালানি ব্যয় আগে প্রায় দুই লাখ ডলার থাকলেও তা বেড়ে তিন লাখ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে আগ্রহী নন।
রপ্তানি আয়ের বড় উৎস পোশাক শিল্প
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ২০২৫ সালে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে এই শিল্পে।
এ অবস্থায় জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। রপ্তানি আয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে চার শতাধিক ছোট পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাজের আদেশ এখন বড় কারখানাগুলো পাচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাব এড়াতে চীন থেকে ব্যবসা সরিয়ে নেওয়া বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠানের নতুন আদেশ আসছে।
তবে নতুন আদেশ পাওয়া মানেই বাড়তি মুনাফা নয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করেও লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই অন্য দেশের কারখানায় চলে যেতে পারেন।
এ কারণে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও উৎপাদনের গতি ও দক্ষতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। হা-মীম গ্রুপের কর্মকর্তারা কর্মীদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পর্যবেক্ষণ করছেন। কোনো কর্মী নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে পড়লে তার কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে শুধু শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং আধুনিক শিল্প অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় বাড়তি ঝুঁকি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সরাসরি চাপে পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা এবং দেশের দুটি ভাসমান গ্যাস পুনঃরূপান্তর টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে এ ধরনের গ্যাস আমদানি ৮৩ শতাংশ কমেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় দিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের উদ্যোগ
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। তবে আগামী পাঁচ বছরের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বর্তমান গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
হা-মীম গ্রুপও তাদের কারখানার ছাদে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। কিন্তু দিনরাত চালু থাকা বড় শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করা কঠিন। সূর্যালোকের অনুপস্থিতিতে উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প বিদ্যুৎ ও কার্যকর শক্তি সংরক্ষণব্যবস্থাও প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন পরিকল্পনা
দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার নতুন জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনায় প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিক করা এবং দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ৩০০টি নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই পরিকল্পনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশা, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ সংকটের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে।
তবে পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার ওপর।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে প্রত্যাশা
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
প্রকল্পটিতে প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যার বড় অংশ রাশিয়ার ঋণ থেকে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আর্থিক লেনদেন ও পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পটির কাজ বারবার পিছিয়েছে। গত ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রকল্পটির অর্থ পরিশোধ ও পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু এবং ধারাবাহিকভাবে চালু রাখার বিষয়টি দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জ্বালানি নিরাপত্তায়
বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি আয় ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ওষুধ, চামড়া, চিকিৎসাসামগ্রী, গাড়ি ও অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশের মতো নতুন শিল্প খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে।
কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া এসব খাতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকট কেবল বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফল নয়; আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান জোরদার করা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিও অনেকাংশে নির্ভর করছে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর।






