রাজশাহী রেলস্টেশনে নিরাপত্তা ঘাটতি, ঝুঁকিতে অস্ত্রাগার ও ট্রেন চলাচল

রাতের বেলায় অস্ত্রাগারে পাহারাদার না থাকার অভিযোগ, তিতুমীর এক্সপ্রেসের পাঁচ বগিতে শক অ্যাবজর্বার নেই; পাওয়ার কারের ডিজেল ট্যাংকার থেকেও তেল চুরির অভিযোগ!
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী রেলস্টেশনে একশ্রেণির রেলকর্মীর দায়িত্বে অবহেলা, বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে যাত্রীসেবা এবং নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্টেশনের অস্ত্রাগারের নিরাপত্তা, ট্রেনের যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং পাওয়ার কারের ডিজেল ট্যাংকার থেকে তেল চুরির অভিযোগে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী রেলস্টেশন প্ল্যাটফর্মের কাছে অবস্থিত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারে রাতের বেলায় নিয়মিত পাহারার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী অস্ত্রাগারের নিরাপত্তায় সাতজন সদস্য পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের কথা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে গত দুই দিন গভীর রাতে অস্ত্রাগারের সামনে গিয়েও কোনো দায়িত্বরত সদস্যকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে অন্তত চারজন সেন্ট্রির দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও রাতের বেলায় এলাকাটি জনশূন্য ও নীরব ছিল বলে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অস্ত্রাগারটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলার চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও দায়িত্বরত সদস্যরা সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তাঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন। তবে এ বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করতে অস্ত্রাগারের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, দায়িত্ব পালনের কার্যক্রম এবং তদারকির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগারগুলোতে রাইফেল, আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সংরক্ষিত থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং সরকারি সম্পদের সুরক্ষার স্বার্থে এসব স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রাগারের নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলা, দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য কিংবা তদারকির ঘাটতিও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ, নিয়মিত পরিদর্শন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।
এদিকে, রাজশাহী থেকে চিলাহাটিগামী তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনের অন্তত পাঁচটি বগিতে শক অ্যাবজর্বার নেই বলে স্থানীয় সাংবাদিক, টুইটনিউজ২৪ প্রতিনিধি ও যাত্রীরা অভিযোগ করছেন। ট্রেনের চলাচলে ঝাঁকুনি নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের আরাম নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রাংশ না থাকায় চলাচলের নিরাপত্তা ও যান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, যন্ত্রাংশগুলো চুরি হওয়ার পর দীর্ঘদিনেও প্রতিস্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত ট্রেন এক্সামিনার সুদেব কুমারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ট্রেনটির প্রকৃত যান্ত্রিক অবস্থা, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং চলাচলের উপযোগিতা রেলওয়ের কারিগরি বিভাগের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রাজশাহী রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের পাওয়ার কারের ডিজেল ট্যাংকার থেকে নিয়মিত তেল চুরির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তেল চুরির পর ট্যাংকারের মুখ খোলা রাখা হচ্ছে। এতে জ্বালানি ছড়িয়ে পড়া বা অন্য কোনো অগ্নিসংযোগের উৎসের সংস্পর্শে এলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে ট্যাংকারের মুখ সুরক্ষিত রাখা, জ্বালানির হিসাব যাচাই এবং নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
সব মিলিয়ে রাজশাহী রেলস্টেশনে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অস্ত্রাগারে পাহারার ব্যবস্থা, তিতুমীর এক্সপ্রেসের যান্ত্রিক নিরাপত্তা এবং ডিজেল চুরির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।
বাংলাদেশের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০১৬-এর ১১ ধারায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনসংগত আদেশ পালন, রেলওয়ে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাত্রী ও যাত্রী এলাকার নিরাপত্তায় সহায়তা করার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অস্ত্র আইন, ১৮৭৮-এ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের বৈধ দখল এবং নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিধান রয়েছে। ফলে অস্ত্রাগারের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা প্রচলিত আইন, প্রযোজ্য বিধিমালা ও দাপ্তরিক নির্দেশনার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করে আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।






