আজারবাইজানে পোশাকবিধি ঘিরে বিতর্ক, হিজাব নিয়ে বিক্ষোভ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়মে ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে আপত্তি; শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, প্রতিবাদ ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
টুইট ডেস্ক: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আজারবাইজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন পোশাকবিধি ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে অনুমোদিত পোশাকবিধির সংশোধনীতে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পোশাক পরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই বিধির প্রয়োগ নিয়েই হিজাব পরা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দেশটির শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা জানিয়েছেন, তাঁকে স্কুলে আর হিজাব পরতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে। তাঁর মতে, হিজাব পরা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং পোশাকের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পোশাকবিধি সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিন্ন পোশাকবিধি নিশ্চিত করা। নতুন নিয়মে বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে—এমন পোশাক পরার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
দেশটির প্রায় ৯৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম। তবে আজারবাইজানের সংবিধানে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন পোশাকবিধি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ
নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে হিজাব পরার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে না পারা শিক্ষার্থীদের কান্নার দৃশ্য দেখা গেছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম বর্জনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে, কারাবন্দি সাংবাদিক পোলাদ আসলানভ নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০২০ সালে দণ্ডিত এই সাংবাদিকের স্ত্রী গুলমিরা আসলানোভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তাঁর অনশনের কথা জানিয়েছেন।
তুরস্কেও প্রতিবাদের ঢেউ
আজারবাইজানের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ প্রতিবেশী তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করেন প্রতিবাদকারীরা। তাঁরা দেশটির কর্তৃপক্ষকে মুসলিম নারীদের পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
এ ঘটনায় তুরস্কের অতীতের একটি বিতর্কও সামনে এসেছে। ১৯৯৭ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিজাব পরা নারীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কর্মরত হিজাব পরা নারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এ বিষয়ে তুরস্কের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাঁর দলের এক অনুষ্ঠানে অন্য দেশকে আজারবাইজানের জীবনযাপনের ধরনে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে, আজারবাইজানের নতুন পোশাকবিধি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনেছে। তবে নতুন বিধির আওতায় হিজাবের ওপর দেশজুড়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। বরং পোশাকবিধির প্রয়োগের কারণে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ থেকেই বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত।






