রামেবি ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

মামলায় ৫০–৬০ জন অজ্ঞাত আসামি; চিকিৎসকদের মানববন্ধনে ‘মব কালচার’-এর প্রতিবাদ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গভীর রাতে নগরীর প্যারামেডিক্যাল এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার ও মুখপাত্র গাজীউর রহমান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রামেবি উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসাইন মঙ্গলবার রাতে রাজপাড়া থানায় মামলাটি করেন। রাতেই মামলা নথিভুক্ত করা হয় এবং ওই মামলার ভিত্তিতেই আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলায় উপাচার্য ও তার ব্যক্তিগত সহকারীকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো এবং ব্যক্তিগত সহকারীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
৬ অক্টোবর উপাচার্যের কার্যালয়ে যা ঘটেছিল
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ২০ থেকে ৫০ জনের একটি দল রামেবির উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করে। ওই সময় অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজ নিয়ে ভার্চুয়াল সভায় অংশ নিচ্ছিলেন।
রামেবির উপ-রেজিস্ট্রার মো. মোফাকখারুল ইসলাম জানান, দলটি উপাচার্যকে কোনো কিছু পড়তে না দিয়ে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দেয়। এ সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসাইন বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরে তাকেও একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দলটি উপাচার্য ও তার ব্যক্তিগত সহকারীর স্বাক্ষর করা দুটি পদত্যাগপত্র নিয়ে যায়। একই সঙ্গে উপাচার্যের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও নিয়ে নেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা দেখতে পান, কার্যালয়ের সিসিটিভি সরঞ্জাম খুলে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং কয়েকটি কক্ষে তালা দেওয়া হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।
রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতির অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্র দাবি করেছে, ঘটনার সময় রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরীফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করে। ওই দলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল এবং জিয়া মঞ্চের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বুলবুল ও লাল্টু ছিলেন বলেও কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
উপাচার্যের অভিযোগ
অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হক জানান, তার কার্যালয়ে প্রবেশকারীদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তার মনে হয়েছে। অন্যরা বহিরাগত ছিলেন এবং তাদের পেছনে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য, তাকে স্থানীয় ঠিকাদারদের পরিবর্তে ঢাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের চুক্তি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এ সময় তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে স্লোগান দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।
উপাচার্যের দাবি, দলটি জোর করে তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়, তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয় এবং পরে কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয়। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানান এবং অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
চিকিৎসকদের মানববন্ধন
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ‘রাজশাহীর সর্বস্তরের চিকিৎসক সমাজ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, একটি ‘মব’ তৈরি করে জাওয়াদুল হককে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার বাদ দিয়ে চিকিৎসকদের রাস্তায় দাঁড়াতে হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. তাসমিয়া আক্তার বলেন, ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক বা চিকিৎসককে যেন এভাবে অপমানিত হতে না হয়। তিনি ঘটনার বিচার দাবি করেন।
ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহসান বলেন, একজন চিকিৎসক ও শিক্ষককে মব তৈরি করে অপমান করা হয়েছে। এতে চিকিৎসক সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
মামলার পর এখন উপাচার্যের কার্যালয়ে কারা প্রবেশ করেছিলেন, কার নির্দেশনায় পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, ব্যক্তিগত সহকারীকে মারধরের অভিযোগের সত্যতা কী, কারা সিসিটিভি সরঞ্জাম খুলে নিয়েছে এবং কারা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেছে—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।
একই সঙ্গে উপাচার্যের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার কথা রয়েছে।
পুলিশ ইতোমধ্যে মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও মামলার অন্য আসামিদের আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।






