অনলাইন জুয়ার টাকা যাচ্ছিল বিদেশে, পাবনায় সিআইডির অভিযানে গ্রেপ্তার ৩

অনলাইন জুয়া থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে, অর্থপাচারের অভিযোগে পাবনায় গ্রেপ্তার ৩। এমএফএস এজেন্ট ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে বেটিং সাইটে সরবরাহের অভিযোগ; বিদেশে অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক খুঁজছে সিআইডি।

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

 

সিআইডির তথ্যমতে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর ২০২৬) পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) ও মো. ইলিয়াস হোসেন রাজুকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, ৬ অক্টোবর রাত ৭টা ২৫ মিনিটে পাবনার আতাইকুলা থানাধীন আর/আতাইকুলা ইউনিয়নের বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই রাতে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানাধীন কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে পরিচালিত হতো বেটিং নেটওয়ার্ক

মামলার এজাহার ও সিআইডির প্রাথমিক তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন সময়ে নতুন নামে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছিল বলে তথ্য পায় সিআইডি।

চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব বেটিং সাইটের প্রচারণা চালাত বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার ব্যবস্থা করা হতো।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টাকা জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো। এ জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হতো।
ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বট মানি যুক্ত করা হতো। এরপর ওই অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বারবার বদলানো হতো হিসাব ও এজেন্ট নম্বর

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বেটিং সাইটগুলোতে অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এসব নম্বর ও হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এসব নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো।

এরপর ওই হিসাবগুলো অনলাইন বেটিংয়ের অর্থ জমা ও উত্তোলনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে সিআইডির তদন্তে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

কমিশন রেখে অর্থ স্থানান্তর, এরপর ক্রিপ্টোকারেন্সি
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সংশ্লিষ্ট এজেন্টরা একত্র করত। এ অর্থ থেকে নির্দিষ্ট কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী ধাপে ওই অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো—প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

তদন্তকারীদের ধারণা, অনলাইন জুয়ার লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গিয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ, কোন কোন ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোন কোন দেশে বা কার কাছে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।

পল্টন থানায় মামলা

সিআইডির নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় অনলাইন বেটিং ও জুয়ার এই নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিআইডির পক্ষ থেকে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করা হয়।

মামলা নম্বর-২৪, তারিখ ১৯ মে ২০২৬। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার প্রাথমিক তদন্তে অনলাইন বেটিং সাইটের অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস নম্বর, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও কার্যক্রম

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) সার্কুলার নং-০৭, জারি ২৮ মে ২০২৫, অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নির্দেশনার পরও সংঘবদ্ধ একটি চক্র অনলাইন বেটিং ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

গ্রেপ্তার তিনজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে তাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চক্রটির অন্য সদস্য, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থ স্থানান্তরের পদ্ধতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে কাজ করছে তদন্তকারী সংস্থা।

সামনে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে

সিআইডি বলছে, মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থপাচারের পদ্ধতি, ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে চক্রের অন্য সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান

সিআইডি সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়া ও বেটিং কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার নামে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের কাছে অর্থ লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন কিংবা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধও করা হয়েছে।

অনলাইন জুয়ার আড়ালে ব্যবহৃত অর্থের উৎস, লেনদেনের পথ এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বিষয়ে তদন্ত শেষ হলে এই চক্রের প্রকৃত পরিধি ও আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

সূত্র: সিআইডি মি‌ডিয়া