ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় পাচার: গ্রেপ্তার ২

দিল্লি-কলম্বো-শারজাহ-কায়রো হয়ে মরুভূমির পথে লিবিয়া; ১২ লাখের চুক্তিতে আদায় ১২ লাখ ৬৭ হাজার, পরে দাবি আরও ৬ লাখ।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি। বিনিময়ে ১২ লাখ টাকা। শুরুতে পাসপোর্ট জমা ও অগ্রিম টাকা নেওয়া। এরপর এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাঠানো—ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে মিশরের কায়রো।
শেষ পর্যন্ত ইতালির বদলে মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে গন্তব্য লিবিয়া। সেখানে কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ। পরিবারের কাছ থেকে আবারও মুক্তিপণের টাকা দাবি।
এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়; পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির তদন্তে উঠে আসা একটি মানবপাচার মামলার অভিযোগের বর্ণনা।
ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে এক যুবকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া, বিভিন্ন দেশের ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে তাঁকে লিবিয়ায় পাঠানো এবং সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
গত ৫ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর থানাধীন আশকোনা হাজি ক্যাম্পের সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রংপুরের পীরগঞ্জের বরিয়ার বাসিন্দা মো. আতিকুর রহমান টমাস (৩২) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার কামালপুরের মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল (৫৪)। তাঁদের বর্তমান ঠিকানা ঢাকার দক্ষিণখান ও আশকোনা এলাকায় বলে মামলার তথ্য থেকে জানা গেছে।
সৌদি থেকে দেশে ফেরার পথে শুরু যোগাযোগ। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী যুবক নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা এবং প্রায় তিন বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফেরার পথে বিমানে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি মানবপাচার চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগে আসেন।
চক্রের সদস্যরা তাঁকে বোঝায়, লিবিয়া হয়ে নিরাপদে ইতালি পাঠানো হবে। এ জন্য ১২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। কথিত এই ‘ইতালি রুট’ই পরে ভুক্তভোগীর জন্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক যাত্রায় পরিণত হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকার আশকোনার একটি অফিসে পাসপোর্ট জমা দিয়ে তিনি অগ্রিম ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন। এর দুই দিন পর, ৭ এপ্রিল তাঁকে প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো।
কলম্বোতে প্রায় ১৬ দিন অবস্থানের পর শুরু হয় নতুন অজুহাতে অর্থ আদায়। পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আরও টাকা নেওয়া হয়। এরপর শারজাহ হয়ে তাঁকে মিশরের কায়রোতে পাঠানো হয়।
ইতালির বদলে কায়রো, এরপর মরুভূমির পথ
কায়রো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, চক্রের এক সদস্য তাঁকে বিমানবন্দর থেকে একটি বাসায় নিয়ে প্রায় পাঁচ দিন আটকে রাখে।
সেখানেও শেষ হয়নি অর্থের দাবি।
আগের চুক্তির কথা বলে তাঁর কাছে আরও ৬ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে নগদ টাকা, বিকাশ এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—১২ লাখ টাকার চুক্তি থাকলে কীভাবে ধাপে ধাপে অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকল? বিদেশে অবস্থানরত একজন যাত্রীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের এই প্রক্রিয়ায় দেশে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল? অর্থগুলো কোন কোন হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তে এসব আর্থিক লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কায়রো থেকে লিবিয়া—ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তপথ
অভিযোগ অনুযায়ী, কায়রো থেকে ভুক্তভোগীকে গাড়িযোগে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে লিবিয়ায় নেওয়া হয়।
এখানেই কথিত বৈধ বিদেশযাত্রার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য সামনে আসে। ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী পৌঁছান লিবিয়ায়। সেখানে চক্রের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে একটি কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রাখেন বলে অভিযোগ।
‘গেম রুম’ শব্দটি মানবপাচারের বিভিন্ন ঘটনায় আগে থেকেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে—লিবিয়ায় ইতালিগামী অভিবাসীদের নৌযাত্রার আগে আটকে রাখার স্থান বোঝাতে এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের নজির রয়েছে।
বন্দিদশায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, লিবিয়ায় আটকে রাখার পর ভুক্তভোগীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয় যখন তাঁর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা শুরু হয়। লিবিয়ায় থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, চক্রটির কার্যক্রম শুধু একজন দালালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বাংলাদেশে যোগাযোগ ও অর্থ সংগ্রহকারী, বিদেশে যাত্রী গ্রহণকারী, পরিবহনকারী এবং আটক রেখে অর্থ আদায়কারী—একাধিক স্তরে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করার সম্ভাবনা তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই নেটওয়ার্কের প্রকৃত বিস্তৃতি কতদূর এবং বিদেশে থাকা সহযোগীরা কারা—তা এখনো তদন্তাধীন।
কারাগারেও মুক্তিপণের দাবি
অভিযোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশগুলোর একটি হলো—লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পরও ভুক্তভোগীকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা বন্ধ হয়নি।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া পুলিশ তাঁকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। তখন তাঁকে মুক্ত করার কথা বলে পরিবারের কাছে আরও ৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অর্থাৎ, ভুক্তভোগী নিজেই যখন বিদেশি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে, তখনও তাঁকে ঘিরে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কে বা কারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কোন নম্বর বা হিসাব ব্যবহার করা হয়েছিল, টাকা কোথায় পাঠানো হয়েছিল এবং সেই অর্থের সুবিধাভোগী কারা?
দেশে ফিরে মামলা, তারপর সিআইডির অভিযান
মামলার তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া পুলিশ ভুক্তভোগীকে দেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফিরে তিনি নিজেই বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।
মামলায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তভার পাওয়ার পর সিআইডি তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করে। এরপর ৫ অক্টোবর ঢাকার আশকোনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান।
নতুন আইনে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান—দুটি আলাদা বাস্তবতা
বাংলাদেশে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান মোকাবিলায় ২০২৬ সালে নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক ও স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অপরাধের ধরন অনুযায়ী কার্যকর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
আইনটির বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই মামলাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর অভিযোগ নয়; বরং প্রলোভন, অর্থ আদায়, বিদেশে নিয়ে যাওয়া, আটকে রাখা, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ দাবির মতো একাধিক অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে।
নতুন আইনে মানবপাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও রয়েছে বলে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
সিআইডির তদন্তে এখন কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
প্রথমত, ১২ লাখ টাকার চুক্তি করা হলেও মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা কীভাবে আদায় করা হলো এবং অতিরিক্ত অর্থের হিসাব কোথায়।
দ্বিতীয়ত, ৬ হাজার মার্কিন ডলার কার কাছে, কীভাবে এবং কোন মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল।
তৃতীয়ত, নয়াদিল্লি, কলম্বো, শারজাহ ও কায়রো—প্রতিটি ট্রানজিটে ভুক্তভোগীকে কারা গ্রহণ ও হস্তান্তর করেছে।
চতুর্থত, কায়রোর কথিত বাসা এবং লিবিয়ার কথিত ‘গেম রুম’ কোথায় ছিল এবং সেখানে আরও কতজন বাংলাদেশি ছিলেন।
পঞ্চমত, দেশে বসে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, বিকাশ/ব্যাংক হিসাবগুলোর প্রকৃত মালিক কারা।
ষষ্ঠত, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির সঙ্গে লিবিয়া, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য দেশে থাকা সহযোগীদের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
সপ্তমত, একই চক্র এর আগে আরও কতজনকে একই রুটে বিদেশ পাঠিয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে কতজন এখনো লিবিয়া বা অন্য দেশে আটকে আছেন।
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, গ্রেপ্তার দুজন কেবল স্থানীয় দালাল, নাকি তাঁরা আরও বড় আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের সক্রিয় অংশ।
শুধু দুই গ্রেপ্তারে কি থামবে তদন্ত
মানবপাচারের ঘটনায় সাধারণত ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহকারী ও বিদেশে যাত্রী গ্রহণকারীরা একই নেটওয়ার্কের ভিন্ন স্তরে কাজ করতে পারে। অতীতে লিবিয়াকেন্দ্রিক মানবপাচারের বিভিন্ন ঘটনায় বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পর জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।
ফলে এই মামলায় গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ/ইমো বা অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যম, পাসপোর্ট চলাচলের তথ্য এবং আন্তর্জাতিক যাত্রাপথের নথি বিশ্লেষণ করা হলে চক্রটির মূল হোতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন—ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে একজন যুবককে লিবিয়ায় পাঠানো এই চক্রের শিকড় কি শুধু আশকোনায়, নাকি এর বিস্তার ঢাকা থেকে কায়রো, শারজাহ ও লিবিয়া পর্যন্ত।
দেশে ফিরে ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের অভিযোগে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলাটি বিমানবন্দর থানার মামলা নং–২১, তারিখ–০৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ। মামলায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬(১), ৬(২), ৭, ৮(১), ৮(২), ১৪, ১৫(১), ১৫(২), ১৮, ১৯ ও ২২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তদন্তভার গ্রহণের পর সিআইডি গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে এবং অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় আসামি মো. আতিকুর রহমান টমাস ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সূত্র: সিআইডি






