বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এমপিও ফেরার অপেক্ষা- ৩৩ বছর ধরে বেতনহীন ১৮ শিক্ষক-কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, তারাগঞ্জ: বিশ্ব শিক্ষক দিবসেও অন্য দিনের মতো সকালে মাদ্রাসায় এসেছেন তারা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের খাতা দেখা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবই চলছে নিয়মমতো। শুধু মাস শেষে বেতন-ভাতা পান না তারা। এভাবে এক-দুই বছর নয়, কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৩ বছর।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর আলহুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার ১৪ শিক্ষক ও ৪ কর্মচারী বেতন ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি পাঠদানের অনুমতি এবং ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি একাডেমিক স্বীকৃতি পায়। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়। তবে হালনাগাদ স্বীকৃতি না থাকায় ২০০১ সালে এমপিও স্থগিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছরেও তা পুনর্বহাল হয়নি।
এমপিও পুনর্বহালের দাবিতে ২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে মামলা করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। মামলার নম্বর ১১৩৯২/১৫। কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই মামলাটির রায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আসে। পরে সরকার পক্ষ আপিল করে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হয়েছে বলে দাবি তাদের। এরপরও এমপিও পুনর্বহাল হয়নি।
মাদ্রাসার সহকারী সিনিয়র শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘৩৩ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছি। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও মাস শেষে কোনো বেতন পাই না। পরিবার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’
ইবতেদায়ী কারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে। শিক্ষকতার কোনো বেতন নেই। সংসারের খরচ চালাতে ক্লাস শেষে অন্যের বাড়িতে কামলা দিতে হয়। সারাদিন ছাত্র পড়াই, আর বিকেলে সংসারের জন্য শ্রমিকের কাজ করি।’
মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘২০০১ সালে হালনাগাদ স্বীকৃতি না থাকায় এমপিও স্থগিত হয়। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলেছে। সর্বশেষ ২২ এপ্রিল ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রায় হয়েছে। এমপিও পুনর্বহাল হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে।’
তারাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শাহীনুর রহমান বলেন, ‘ঘনিরামপুর আলহুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসাটি ১৯৯৭ সাল থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।’
দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে বেতন ছাড়াই পাঠদান ও দায়িত্ব পালন করে আসছেন মাদ্রাসাটির ১৮ শিক্ষক-কর্মচারী। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত এমপিও পুনর্বহাল হবে এবং শেষ হবে তাদের বেতনহীন কর্মজীবনের অপেক্ষা।






