গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন: ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত

নতুন আইনে গুমের শাস্তি, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ; মানবাধিকার কমিশনকেও দেওয়া হয়েছে বাড়তি ক্ষমতা

টুইট ডেস্ক: গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত নতুন আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। চলতি বছর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এসব আইনের মাধ্যমে গুমের ঘটনায় শাস্তির বিধান, ভুক্তভোগী ও পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ অনুযায়ী, গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তি কমপক্ষে তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। গুমের ঘটনায় ব্যক্তির মৃত্যু হলে, লাশ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডও হতে পারে।

আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিজে অথবা সরকারের সমর্থন, অনুমোদন কিংবা সম্মতিতে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান গোপন করলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হবে।

গুমের ঘটনায় আদালত আরোপিত অর্থদণ্ডকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগীকে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা যাবে। সেখান থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ভুক্তভোগীকে সেই অর্থ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারের জন্যও আইনে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা আদালতের অনুমতি নিয়ে গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহার বা হস্তান্তর করতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ থাকলে এবং জীবিত ফিরে না এলে তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের ঘোষণাও চাইতে পারবেন।

এদিকে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ পাস হয়েছে। নতুন আইনে কমিশনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সমন জারিসহ দেওয়ানি আদালতের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সুযোগও রাখা হয়েছে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনেও নতুন পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করা গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার রাখবেন।

এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। ব্যাংক খাতেও নতুন আইন করা হয়েছে। ব্যাংক পুনর্গঠন আইনের সংশোধনের ফলে একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের সাবেক মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট শর্তে আগের মালিকানা, সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের প্রথম সাত মাসে শতাধিক আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আইনের মধ্যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন, মানব পাচার প্রতিরোধ, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং জুয়া প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনও রয়েছে।