মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে জুবাইদার সাক্ষাৎ, কূটনীতিতে নতুন বার্তা

শিশুদের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা।
এম.বি. আলম: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Fostering the Future Together’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নিয়েছেন। অনুষ্ঠানে মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হয়েছে।
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে দ্য সেন্ট রেজিস নিউইয়র্কে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে শিশুদের শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফার্স্ট স্পাউস ও প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগটির লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং শিশু ও তরুণদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বরের আয়োজনে ‘Fostering the Future Together’ জোটের অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ৫৭-তে উন্নীত হয়।
শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব
নিউইয়র্কের আয়োজনে মেলানিয়া ট্রাম্প শিশুদের ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষা ও প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর উদ্যোগের আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষাপ্রযুক্তি, ডিজিটাল দক্ষতা এবং অনলাইন নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এ পর্যায়ে অ্যাডোবি, অ্যামাজন, ইন্টেল, স্টারলিংক, গুগল ও জুমের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি অংশীদারত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে অ্যাপলের নির্বাহী চেয়ারম্যান টিম কুক এবং পেপালের প্রধান নির্বাহী এনরিকে লোরেসও উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে জি-২০, আসিয়ান সম্মেলন, ইউরোপীয় আঞ্চলিক সভা এবং ক্যারিবীয় আঞ্চলিক সভাসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা ও প্রযুক্তির সুযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা বিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
জুবাইদা রহমানের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা
‘Fostering the Future Together’ উদ্যোগে ডা. জুবাইদা রহমানের সম্পৃক্ততা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের মার্চে মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ‘Fostering the Future Together: Global Coalition Summit’-এ অংশ নেন।
মার্চের ওই সম্মেলনে বিশ্বের ৪৫টির বেশি দেশের ফার্স্ট লেডি ও রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সহধর্মিণীরা অংশ নেন। সেখানে ডা. জুবাইদা রহমান শিশুদের কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি এবং শিশু ও পরিবারের জন্য বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।
ওই সফরে ২৫ মার্চ মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, দুইজন শিশুদের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ওয়াশিংটন সম্মেলনে শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়। সম্মেলনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নে প্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহার তুলে ধরা হয়।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের উপস্থিতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন ডা. জুবাইদা রহমান। এর মধ্যেই মেলানিয়া ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সম্পৃক্ততাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ ধরনের কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব, শিশু কল্যাণ, শিক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২২ সেপ্টেম্বরের আয়োজনে ডা. জুবাইদা রহমানের অংশগ্রহণ এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শিশুদের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়কে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র
‘Fostering the Future Together’ উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা থাকায় বাংলাদেশের জন্যও ভবিষ্যতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।
বিশেষ করে দ্রুত পরিবর্তনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে এসব বিষয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার আওতায় আনা হচ্ছে।
নরম শক্তি কূটনীতির নতুন পরিসর
বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক সাধারণত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, অভিবাসন ও কূটনৈতিক সহযোগিতাকে ঘিরে আলোচিত হলেও শিশুদের কল্যাণ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানব উন্নয়নভিত্তিক যোগাযোগ সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
ফার্স্ট স্পাউস পর্যায়ের এ ধরনের যোগাযোগ সরাসরি রাষ্ট্রীয় চুক্তি বা দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়। তবে সামাজিক ও মানবিক বিষয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তারে এটি সহায়ক হতে পারে।
ডা. জুবাইদা রহমানের মার্চের ওয়াশিংটন সম্মেলন থেকে সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক আয়োজন পর্যন্ত ধারাবাহিক অংশগ্রহণ সেই সম্পৃক্ততাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। একই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় দেশের উপস্থিতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরছে।
সামনে বাস্তব সহযোগিতার সুযোগ
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এ ধরনের সম্পৃক্ততার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে তা বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘Fostering the Future Together’ উদ্যোগটি বর্তমানে ৫৭টি দেশকে যুক্ত করেছে। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, জোটটি শিশুদের প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন এবং তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমানের সাক্ষাৎ এবং ‘Fostering the Future Together’ আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শিশুদের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন একটি পরিসর সামনে এনেছে। মার্চের ওয়াশিংটন সম্মেলন এবং সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কের জাতিসংঘ অধিবেশনকেন্দ্রিক আয়োজন—দুই পর্যায়ের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বৈশ্বিক উদ্যোগে ধারাবাহিক অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরছে।
এখন এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিশু সুরক্ষা ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার সুযোগই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।






