অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহীর ঐতিহ্যের সাক্ষী ঢোপকল

১৯৩৭ সালে আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা করেছিল ঢোপকল; নগরায়ণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এসব স্থাপনা।
টুইট ডেস্ক: ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাজশাহীর নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন ঢোপকল। একসময় নগরবাসীর নিরাপদ সুপেয় পানির অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এসব স্থাপনা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের কারণে রাজশাহীর ঐতিহ্যের এই সাক্ষীগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে।
১৯৩৭ সালে ঢোপকলের মাধ্যমে রাজশাহী শহরে আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা হয়। একসময় নগরজুড়ে অর্ধশতাধিক ঢোপকল থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচটি। বেলদারপাড়া, ফায়ার সার্ভিস মোড়, পাঠানপাড়া, রাণীবাজার, অলোকার মোড় ও কুমারপাড়া এলাকায় কয়েকটি ঢোপকল কোনোভাবে টিকে আছে। তবে অনেকগুলোরই অবস্থা নাজুক।
জানা যায়, বিশ শতকের ত্রিশের দশকে রাজশাহী শহরে নিরাপদ পানির সংকট ছিল তীব্র। পুকুর, কূপ ও অন্যান্য জলাধারের পানির ওপর নির্ভরশীল নগরবাসীর মধ্যে কলেরা, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ত। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান রায় ডি. এন. দাশগুপ্তের উদ্যোগে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় নিরাপদ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও জনবহুল এলাকায় ঢোপকল স্থাপন করা হয়। ১৯৩৭ সালের আগস্টে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ নামে পানি শোধন ও সরবরাহ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সে সময় প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয়। এর অন্যতম বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মহারানী হেমন্ত কুমারী। তিনি প্রায় ৬৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিতে পানি শোধনাগারটির নাম রাখা হয় ‘মহারানী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। পরে সেখানকার পানিকলগুলো ‘হেমন্ত কুমারী ঢোপকল’ নামে পরিচিতি পায়।
ঢোপকলের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ছিল সে সময়ের তুলনায় আধুনিক। পানি শোধনাগারে পাথরকুচি ও বালির স্তরের মাধ্যমে পানি পরিশোধনের পর সিমেন্টের মোটা পাইপ দিয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার ঢোপকলে সরবরাহ করা হতো। প্রতিটি ঢোপকলে প্রায় ৪৭০ গ্যালন পানি ধারণের ব্যবস্থা ছিল। ভেতরের পরিশোধন ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি আরও একবার পরিষ্কার হয়ে বাইরে আসত।
নগরবাসী দিনের যেকোনো সময় এসব ঢোপকল থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারতেন। পানির মান ঠিক রাখতে নির্দিষ্ট সময় পরপর ঢোপকল পরিষ্কার করা হতো এবং পরীক্ষাগারে পানির নমুনা পাঠিয়ে গুণগত মান পরীক্ষা করা হতো। প্রায় ১২ ফুট উঁচু ও চার ফুট ব্যাসের গোলাকার এসব স্থাপনা সিমেন্ট, ইটের খোয়া ও বিশেষ ঢালাই প্রযুক্তিতে নির্মিত হয়েছিল। ঢেউ খেলানো নকশার কারণে ঢোপকলগুলো দূর থেকেই সহজে চেনা যেত।
প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় ঢোপকল শুধু পানি সংগ্রহের স্থান ছিল না, বরং এলাকার পরিচয়ের অংশও ছিল। কোনো স্থানের ঠিকানা বোঝাতেও ঢোপকলের নাম ব্যবহার করা হতো।
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে ঘরে ঘরে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হলে ঢোপকলের ব্যবহার কমতে থাকে। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নগর উন্নয়নকাজ ও দখল-অবহেলার কারণে একে একে হারিয়ে যেতে থাকে ঐতিহাসিক এসব স্থাপনা।
রাজশাহীর ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন রাজশাহী হেরিটেজের সমন্বয়ক আবদুল মান্নান বলেন, ঢোপকল রাজশাহীর নগর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মিশু জানান, বর্তমানে নগরীতে কতটি ঢোপকল রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কয়েকটি ঢোপকল সংরক্ষণও করা হয়েছে।
ফোকলোর ও উন্নয়ন গবেষক এস এম তাহমিদ হাসান বলেন, ঢোপকল শুধু পুরোনো পানির উৎস নয়, এটি রাজশাহীর জলসভ্যতা, প্রযুক্তি ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের স্মারক। এসব স্থাপনার সঙ্গে নগরীর ইতিহাস ও লোকস্মৃতির সম্পর্ক রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, ছোট আকারের স্থাপনা হওয়ায় ঢোপকলগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গেজেটভুক্ত করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, সড়ক উন্নয়নের প্রয়োজনে নগরীর কয়েকটি স্থানের ঢোপকল স্থানান্তর করতে হয়েছে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নগরীর ইতিহাস তুলে ধরতে নতুন করে কয়েকটি ঢোপকল স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি স্থানে ঢোপকল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।






