ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যুদ্ধ, প্রতিরোধে যুবসমাজকে মাঠে নামার ডাক প্রধানমন্ত্রীর

প্রতি শনিবার একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান; ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক-কর্মীর অংশগ্রহণ—‘প্রতিদিন জমে থাকা পানি সরান’ স্লোগানে জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ।

টুইট প্রতি‌বেদক: ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে দেশব্যাপী আরও জোরদার করতে তিন মাসব্যাপী ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ শুরু হয়েছে।

শনিবার  (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, স্কাউটস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সচিব এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। একই সময়ে দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

তিন মাস চলবে দেশব্যাপী অভিযান

১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান চলবে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অভিযানের মূল স্লোগান—‘নিজের আশপাশ পরিষ্কার রাখি, সবাই মিলে সুস্থ থাকি’ এবং ‘প্রতিদিন জমে থাকা পানি সরান’।

মহানগর, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিতভাবে অভিযানটি বাস্তবায়ন করা হবে। মহানগর এলাকায় সিটি করপোরেশন, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এ কার্যক্রম সমন্বয় করবেন।

অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইডস, রেড ক্রিসেন্ট এবং শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি শনিবার সারাদেশে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বক্তব্য দেন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অভিযান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

একসঙ্গে কাজ করলে কোনো বাধাই ঠেকাতে পারবে না’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, দেশের পরিবর্তন আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে দেশ গঠন করতে চাইলে কোনো বাধাই তা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।

তিনি বলেন, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। শতভাগ সমাধান সম্ভব না হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ সাফল্য আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিজেকে সুস্থ রাখি, সমাজকে সুস্থ রাখি।’ প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে পরিচ্ছন্নতার জন্য সময় দিলেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। বাড়ি, স্কুল-কলেজ কিংবা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জমে থাকা পানিই ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু সাধারণত ভাঙা পাত্র, প্লাস্টিক কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। তাই এসব উৎস পরিষ্কার ও ধ্বংস করতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শুধু সরকারি সংস্থার অভিযান দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; নাগরিকদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এবং নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যুবসমাজকে দেশ গঠনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান

দেশের বিপুল যুবশক্তিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমসহ সামগ্রিক রাষ্ট্র গঠনে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশে স্কাউটসের সদস্য প্রায় ২৩ লাখ, বিএনসিসির সদস্য ২২ হাজার। উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষার্থী এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষার্থী। এত বড় যুবসমাজ দেশ গঠনের কাজে যুক্ত হলে কোনো শক্তিই তাদের ঠেকাতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের মানুষ দেখিয়েছে পরিবর্তন সম্ভব। এবার রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করতে হবে।

যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন দেশ গঠনে প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা রয়েছে।

যারা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেবেন, তাদের রাস্তায় আবর্জনা ফেলার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি। পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশকে রক্ষা করতে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।

যুবকদের শপথ পাঠ

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ‘পরিচ্ছন্ন পরিবার, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়ার সংকল্প নিয়ে উপস্থিত যুবকদের শপথ পাঠ করান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর আগে তিনি বিভিন্ন স্টল পঙরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে করমর্দনও করেন।

উচ্চ ঝুঁকির মৌসুম সামনে রেখে সমন্বিত উদ্যোগ

ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির মৌসুমকে বিবেচনায় নিয়েই এবারের তিন মাসের দেশব্যাপী অভিযান শুরু করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে এ কর্মসূচির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিন মাসের এ কর্মসূচিতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ, নাগরিক সচেতনতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।