টিকাদান ঘাটতিতে বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম, ১ হাজার মৃত্যু: রয়টার্সের প্রতিবেদন

মার্চ থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী; হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি, হাম-ডেঙ্গুর চাপে বিপর্যস্ত চিকিৎসাব্যবস্থা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। চলতি বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, শয্যাসংকট ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির মধ্যেই নতুন করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯, যার মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। এ সময় ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

টিকাদানে বড় ঘাটতিই মূল কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং টিকার সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে হাম ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এর প্রভাব পড়েছে টিকার সরবরাহ ও টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন সোমবার সংসদে জানান, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিলের কারণে আরও বেশি শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্নকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

নির্মূলের পথে থাকা দেশেই ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশ গত এক দশকের বড় সময় হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় রাখা প্রয়োজন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় কিছুটা কমে গেলেও বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি টিকাদান কাভারেজ বজায় রেখেছিল।

কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদান ঘাটতি সেই সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ফাঁক তৈরি করেছে।

রোগতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, এত বিপুলসংখ্যক শিশুর হাম আক্রান্ত হওয়া এবং একই বছরে এত বেশি রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে আগে দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করা জরুরি।

নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমার বাইরে থাকা ছোট শিশুরা এ ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতির কারণে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক তৈরি হয়েছে। এর ফলে সংক্রমণ এক বয়সগোষ্ঠী থেকে অন্য বয়সগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার জন্য অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হওয়ায় তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। ফলে আশপাশের জনগোষ্ঠীর টিকাদান কাভারেজ কমে গেলে এসব শিশুর ওপর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

হাম-ডেঙ্গুর চাপে হাসপাতাল

হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই বাংলাদেশে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। ফলে দেশের ইতোমধ্যে চাপের মুখে থাকা হাসপাতালগুলোকে একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের রোগী সামলাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে এক দিনে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ হাজার ৫৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—চলতি বছরের এক দিনে মৃত্যু ও ভর্তি উভয় ক্ষেত্রেই যা সর্বোচ্চ।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি যে সবাইকে শয্যা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, হাম রোগীদের জন্য হাসপাতালে ৬০টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালটি সাধারণত ১ হাজার ৩৫০ রোগীর চিকিৎসার উপযোগী হলেও বর্তমানে সেখানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন।

এ ছাড়া শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে জানান তিনি।

টিকা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা পরিবারের

হাম প্রাদুর্ভাবের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের অভিজ্ঞতায়ও। ঢাকার ৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পর অবশেষে একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো সম্ভব হয়। ১০ দিন পর ছাড়পত্র পেলেও শিশুটি এখনও বারবার জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকার কারণে তাঁর ছেলের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গেলে তাকে জানানো হয়, তখন টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর বড় চার সন্তান অবশ্য নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।

কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই ধরনের অনিশ্চয়তা। হাসপাতাল থেকে ছাড়ার কয়েক দিন পর শিশুটির শরীরে ফুসকুড়িসহ হামসদৃশ উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর পরিবারটি একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ঘুরতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে যায়।

রিপন বলেন, তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরছেন, কিন্তু সঠিক তথ্যও পাচ্ছেন না।

জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে ১ কোটি ৯৭ লাখ শিশু

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। শুরুতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি চালালেই হবে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের জন্য বিশেষভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে।

প্রতিরোধযোগ্য রোগে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি দেখা দিলেও রোগটি প্রতিরোধযোগ্য। দুই ডোজ টিকা হাম থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমান হাম পরিস্থিতি তাই শুধু একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিকে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্বৈত স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পুনরুদ্ধার, টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হাম আক্রান্ত শিশুর মা নাসিমা বেগমের আকুতি এই সংকটের মানবিক দিকটিও তুলে ধরে। তাঁর ভাষায়, চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। তিনি শুধু চান তাঁর সন্তান সুস্থ হয়ে উঠুক এবং অন্য কোনো মাকে যেন নিজের সন্তানকে এভাবে কষ্ট পেতে বা এই রোগে মারা যেতে না হয়।

সুত্র: রয়টার্সের প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন রুমা পাল; অতিরিক্ত তথ্য দিয়েছেন জেনিফার রিগবি ও স্যাম জাহান।