লাল চুলের নারীর আগ্রহ থেকেই জন্ম ‘জোলিন’, বিদায় ডলি পার্টন

স্বামীর প্রতি অন্য নারীর আকর্ষণ থেকে লেখা গান হয়ে ওঠে কালজয়ী; ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’, ‘নাইন টু ফাইভ’-এর স্রষ্টার ৮০ বছরের জীবনের অবসান।
টুইট ডেস্ক: কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গীতিকার, অভিনেত্রী, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী ডলি পার্টন আর নেই। ২৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে ৮০ বছর বয়সে মারা যান তিনি। প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যানসার সেন্টারে স্বজনদের উপস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ছয় দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে ডলি শুধু গান করেননি, নিজের জীবন, সম্পর্ক, শৈশব, দারিদ্র্য, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্পকে গানের ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা ‘জোলিন’, ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’, ‘কোট অব ম্যানি কালারস’ ও ‘নাইন টু ফাইভ’ প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে অমর হয়ে আছে।
‘জোলিন’-এর জন্ম যে গল্পে
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জোলিন’ ডলি পার্টনের সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। গানটির পেছনে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ডলি জানিয়েছিলেন, লাল চুলের এক ব্যাংককর্মী তাঁর স্বামীর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতেন। সেই পরিস্থিতি থেকে জন্ম নেয় স্বামীকে অন্য নারীর কাছ থেকে হারানোর আশঙ্কা এবং সেই অনুভূতিই রূপ নেয় ‘জোলিন’-এ।
তবে গানটি কেবল দাম্পত্যের একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হয়ে থাকেনি। প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়, অনিশ্চয়তা ও ঈর্ষার মতো সর্বজনীন অনুভূতিকে ডলি এমনভাবে গানে তুলে ধরেন, যা বিশ্বের অসংখ্য শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী গানটির নিজস্ব পরিবেশন করেছেন।
যে গান এলভিসকে দিতে চাননি
‘জোলিন’-এর পরের বছর ডলি লেখেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। দীর্ঘদিনের সহশিল্পী ও পরামর্শক পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে পেশাগত বিচ্ছেদের সময় তাঁকে সম্মান জানিয়ে গানটি লিখেছিলেন তিনি।
গানটি পরে এলভিস প্রিসলি নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এলভিসের ব্যবস্থাপক গানের প্রকাশনাস্বত্বের অংশ দাবি করলে ডলি তাতে রাজি হননি। সম্ভাব্য বড় সুযোগ হাতছাড়া হলেও নিজের সৃষ্টির স্বত্ব ধরে রাখার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন তিনি।
১৯৯২ সালে ‘দ্য বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে গানটি নতুন করে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। ফলে ডলির লেখা গানটি সংগীতের ইতিহাসে আরও বড় জায়গা করে নেয়।
শৈশবের গল্পও ছিল গানে
ডলির সংগীতে বারবার ফিরে এসেছে তাঁর শৈশব। ‘কোট অব ম্যানি কালারস’ গানে উঠে এসেছে মায়ের হাতে পুরোনো কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি করে দেওয়া একটি কোটের গল্প। সেই পোশাক পরে স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মায়ের ভালোবাসাকে তিনি পোশাকের চেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে দেখেছিলেন।
‘মাই টেনেসি মাউন্টেন হোম’ গানেও রয়েছে তাঁর শৈশব, পরিবার ও পাহাড়ঘেরা জন্মভূমির স্মৃতি। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো ছিন্ন করেননি ডলি।
সাধারণ মানুষের কথাই ছিল তাঁর শক্তি
১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র ‘নাইন টু ফাইভ’-এর জন্য লেখা একই নামের গানটি কর্মজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রের একঘেয়েমি, পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়া এবং নারীর প্রতি বৈষম্যের বিষয় উঠে আসে এতে।
ডলির গীতিকারসত্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ ভাষায় তুলে ধরা। প্রেম, বিচ্ছেদ, পরিবার, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও আশার গল্প তাঁর গানের মূল উপাদান ছিল। জীবদ্দশায় তিনি তিন হাজারের বেশি গান লিখেছেন বলে বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাঠের ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির সেভিয়ার কাউন্টির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলি রেবেকা পার্টনের। ১২ ভাই-বোনের পরিবারে দারিদ্র্যের মধ্যে এক কক্ষের কাঠের ঘরে তাঁর শৈশব কাটে।
ছোটবেলা থেকেই সংগীত ছিল তাঁর আশ্রয়। মায়ের কাছ থেকে লোকগান ও পাহাড়ি সংগীত শুনে বড় হন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে গান লেখা শুরু করেন, আট বছর বয়সে হাতে ওঠে গিটার। কৈশোরেই স্থানীয় বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন এবং ১৩ বছর বয়সে গ্র্যান্ড অলে অপ্রিতে পরিবেশনের সুযোগ পান।
পড়াশোনা শেষ করে গানের স্বপ্ন নিয়ে ন্যাশভিলে পাড়ি জমান ডলি। সঙ্গে ছিল নিজের লেখা গানে ভরা একটি স্যুটকেস। সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বসংগীতের অন্যতম উজ্জ্বল ক্যারিয়ার।
সংগীতের বাইরে অভিনয় ও ব্যবসা
সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও সফল হন ডলি। ‘নাইন টু ফাইভ’, ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ ও ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসা পান। চলচ্চিত্রের জন্য লেখা গানের সুবাদে অস্কারের সেরা মৌলিক গানের মনোনয়নও পেয়েছেন তিনি।
উদ্যোক্তা হিসেবেও তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। টেনেসিতে প্রতিষ্ঠিত ‘ডলিউড’ পরিণত হয় জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রে। ডলির সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান তাঁর জন্মভূমির মানুষের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে। তাঁর মৃত্যুর পরও ডলিউড চালু রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কোটি শিশুর হাতে বই
ডলির মানবিক কর্মকাণ্ড তাঁর শিল্পী পরিচয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই ছিল এর লক্ষ্য। তাঁর উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে শিশুদের হাতে কোটি কোটি বিনা মূল্যের বই পৌঁছেছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় টিকা গবেষণায় তিনি ১০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদানও দিয়েছিলেন। শিক্ষা, শিশুদের কল্যাণ ও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন এই শিল্পী।
দীর্ঘ স্বীকৃতির তালিকাকর্মজীবনে ডলি পার্টন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক গ্র্যামি পুরস্কার ও গ্র্যামির আজীবন সম্মাননা। কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেম, সং রাইটার্স হল অব ফেম এবং রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।
প্রায় ৬০ বছরের জীবনসঙ্গী কার্ল ডিন ২০২৫ সালের মার্চে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে কয়েকটি কর্মসূচি বাতিল ও স্থগিত করেছিলেন ডলি। তবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নতুন সংগীত, বই ও নিজের জীবনভিত্তিক মঞ্চনাটকসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
টেনেসির দরিদ্র পরিবারের এক কক্ষের কাঠের ঘর থেকে উঠে এসে ডলি পার্টন হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বসংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখ। তাঁর গানের গল্পে ছিল নিজের জীবন, মানুষের ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সংগ্রাম ও স্বপ্ন। তাই তাঁর মৃত্যু সংগীতজগতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও ‘জোলিন’, ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ কিংবা ‘নাইন টু ফাইভ’-এর মতো সৃষ্টিতে ডলি পার্টনের উপস্থিতি দীর্ঘদিন অমলিন থাকবে।






