মির্জা ফখরুলের আগে দেশের ১৮ রাষ্ট্রপতি, কে কতদিন ছিলেন

স্বাধীনতার পর অস্থায়ী, ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ-বিভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮ জন

টুইট ডেস্ক: মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ভোটে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১৯ জন।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নানা সময়ে অস্থায়ী, ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান, নির্বাচন ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের কারণে অনেকের মেয়াদ ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। আবার কেউ কেউ একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা চালু হলে শেখ মুজিবুর রহমান আবার রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

আবু সাঈদ চৌধুরী

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।

মুহম্মদুল্লাহ

আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন সংসদ স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

খন্দকার মোশতাক আহমদ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ৬ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।

জিয়াউর রহমান

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

আবদুস সাত্তার

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী

১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ আবদুস সাত্তারের স্থলাভিষিক্ত হন বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী। প্রায় নয় মাস রাষ্ট্রপতি থাকার পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি পদ ছাড়েন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকেন। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়েন তিনি।

সাহাবুদ্দিন আহমদ

এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর দায়িত্ব থেকে সরে যান তিনি। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি বিদায় নেন। দুই দফায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আব্দুর রহমান বিশ্বাস

সাহাবুদ্দিন আহমদের পর ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।

একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।

মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সংসদ স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

মো. জিল্লুর রহমান

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হন মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।

মো. আবদুল হামিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমান অসুস্থ থাকায় ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। পরে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হন। দুই মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল দায়িত্ব ছাড়েন তিনি।

মো. সাহাবুদ্দিন

আবদুল হামিদের পর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন তিনি।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির তালিকায় যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়।