লোডশেডিংয়ে হিমাগারে আলু রক্ষা, বাড়ছে জেনারেটর খরচ

বিদ্যুৎ গেলেই জেনারেটর; প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৮-১০ হাজার টাকা ব্যয়, অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণে পচনের ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্যাস সংকটের কারণে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর হিমাগার মালিকেরা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আলু পচন থেকে রক্ষা করতে চালাতে হচ্ছে জেনারেটর। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা জ্বালানি খরচ হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হিমাগার মালিকেরা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় ৩৯টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি বর্তমানে সচল। এসব হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।
তবে চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক হিমাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৌসুমের শুরুতে রাজনৈতিক চাপের কারণে কিছু হিমাগারকে অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একদিকে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট—দুইয়ে মিলে পচনের ঝুঁকি বাড়ছে। এরই মধ্যে রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকায় অবস্থিত তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজ থেকে প্রতিদিন গাড়িভর্তি করে পচা আলু বের করে ফেলার চিত্র দেখা গেছে।
এই হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত আলু নেওয়া হয়েছিল। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু ঘেমে পচে যাচ্ছে। পচে যাওয়া আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী অবশ্য আলু পচনের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে দায়ী করছেন না। তাঁর দাবি, হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনার কারণেই আলু নষ্ট হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের কারণেই পচনের ঝুঁকি বেড়েছে। একটি হিমাগারে বছরে ২৫ থেকে ৩০ বার আলুর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। এ সময় আলু বের করে বাতাস দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত আলু থাকায় অনেক হিমাগার এবার এ প্রক্রিয়া ঠিকভাবে করতে পারছে না।
তিনি জানান, রাজশাহীর আলাইবিদিরপুরে রহমান ব্রাদার্স-১ হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। একইভাবে প্রায় সব হিমাগারেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরুতে চাপের কারণে কিছু হিমাগার অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে হিমাগার ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো সমস্যা হচ্ছে না এবং এতে আলুরও সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগার মালিকদের ব্যয় বাড়ার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলেও এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হিমাগারের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু এর বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জ্বালানি তেল ব্যবহার করে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এমনিতেই হিমাগারগুলোর বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি। প্রতিটি হিমাগারকে মাসে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। এর সঙ্গে জেনারেটরের জ্বালানি খরচ যোগ হওয়ায় মালিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তাই হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, গত বুধবার থেকে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি ভালো। হিমাগারে বিদ্যুৎ সংকটজনিত সমস্যা হচ্ছে-এমন অভিযোগ জানিয়ে কেউ তাঁকে ফোন করেননি বলেও জানান তিনি।
রাজশাহীর হিমাগার খাতে চলমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সংরক্ষিত আলুর মান ধরে রাখা। বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন জেনারেটরের মাধ্যমে সামাল দেওয়া গেলেও অতিরিক্ত সংরক্ষণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকলে আলু পচন ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক-তিন পক্ষই।






