গাঁজা শনাক্তের পর ৪০০ পাইলটের পরীক্ষা: উড্ডয়ন থেকে সরলেন আরও দুইজন

ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটে এক পাইলটের শরীরে গাঁজা শনাক্তের পর বিশেষ পরীক্ষা; প্রাথমিক ফল নন-নেগেটিভ দুই পাইলটের নমুনা পাঠানো হয়েছে চূড়ান্ত পরীক্ষায়।

বিশ্ব ডেস্ক: এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলটদের মাদক পরীক্ষা ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটে এক পাইলটের মাদক পরীক্ষায় গাঁজার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর এয়ার ইন্ডিয়া ও এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের সব পাইলটের জন্য বিশেষ মাদক পরীক্ষা শুরু করা হয়। সেই পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পাইলটের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে আরও দুই পাইলটের প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘নন-নেগেটিভ’ ফল পাওয়া গেছে।

তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘নন-নেগেটিভ’ ফল পাওয়া মানেই কোনো পাইলট মাদক গ্রহণ করেছেন—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ধরনের ফল পাওয়া গেলে নমুনা নির্ধারিত পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করা হয়। নতুন দুই পাইলটের ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া চলছে। চূড়ান্ত ফল না আসা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দুই পাইলটকেই সাময়িকভাবে উড্ডয়ন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের নিশ্চিতকরণ পরীক্ষার ফল পাওয়ার কথা। ফল পজিটিভ হলে ভারতীয় বিমান চলাচলবিষয়ক বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ঘটনার সূত্রপাত

ঘটনার সূত্রপাত ৪ আগস্ট। ওই দিন ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার এয়ারবাস এ৩২০ উড়োজাহাজের ফ্লাইট এআই-২৩৭৯ ক্রুজিং অবস্থায় হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। উড়োজাহাজটি পরে নিয়ন্ত্রণে আসে এবং নিরাপদে দিল্লিতে অবতরণ করে। এ ঘটনায় যাত্রী ও ক্রুসহ ২৪ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ঘটনার পর উড়োজাহাজটির দুই পাইলটের বাধ্যতামূলক মনঃপ্রভাবকারী পদার্থের পরীক্ষা করা হয়। পাইলট-ইন-কমান্ডের প্রাথমিক পরীক্ষার ফল নন-নেগেটিভ আসে। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য তাঁর নমুনা নির্ধারিত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় এবং পরে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় গাঁজার উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এই পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দুই পাইলটকেই উড্ডয়ন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় এবং ঘটনার তদন্ত শুরু হয়। তবে পাইলটের মাদক পরীক্ষার ফল এবং উড়োজাহাজটির হঠাৎ উচ্চতা হারানোর ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো কারণ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেননি।

যান্ত্রিক ত্রুটির দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

ঘটনাটিকে শুধু পাইলটের মাদক পরীক্ষার ফল দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না। এয়ারবাসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে উড়োজাহাজটির তিনটি জলচাপ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপহ্রাস এবং গুরুত্বপূর্ণ উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য সমস্যা হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এ সময় উড়োজাহাজের এলিভেটর ও আইলারন স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিচ্ছিল না বলে এয়ারবাসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে উড়োজাহাজটির জলচাপ ব্যবস্থা, বিভিন্ন সংবেদক, তারের সংযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাসও পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো প্রযুক্তিগত ও মানবিক—দুই দিকই খতিয়ে দেখছে। তদন্তে এয়ারবাস ও ফ্রান্সের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা বিইএ-ও সহায়তা করছে।

সব পাইলটের পরীক্ষা

ঘটনার পর এয়ার ইন্ডিয়া তাদের সব পাইলটের জন্য বিশেষ মাদক ও নিষিদ্ধ পদার্থের পরীক্ষা শুরু করে। এয়ার ইন্ডিয়ার পাশাপাশি এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের পাইলটরাও এই পরীক্ষার আওতায় রয়েছেন। ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি নিয়মিত এলোমেলো পরীক্ষার অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণকাল, উড্ডয়নের পর এবং নির্ধারিত বিভিন্ন কেন্দ্রে নমুনা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের বিদ্যমান বিধিতে বছরে অন্তত ১০ শতাংশ ফ্লাইট ক্রুর মনঃপ্রভাবকারী পদার্থের জন্য এলোমেলো পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এয়ার ইন্ডিয়া তার পুরো পাইলট গোষ্ঠীকে একবারের বিশেষ পরীক্ষার আওতায় আনছে।

কেন এত গুরুত্ব

বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের পাইলটদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা সরাসরি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পাইলটের মাদক পরীক্ষায় নিশ্চিত পজিটিভ ফল পাওয়ার পর একই প্রতিষ্ঠানের অন্য পাইলটদের ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তকে বিমান নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় নন-নেগেটিভ ফল এবং নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় পজিটিভ ফল—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। নতুন দুই পাইলটের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত তাদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক পরীক্ষার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।

তদন্তে একাধিক প্রশ্ন

ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের ঘটনায় এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা—উড়োজাহাজ কেন হঠাৎ উচ্চতা হারিয়েছিল, জলচাপ ব্যবস্থার সমস্যার ভূমিকা কতটা ছিল, ককপিটে দুই পাইলটের ভূমিকা কী ছিল এবং পাইলটের নিশ্চিত মাদক পরীক্ষার ফল ঘটনাটির সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য থেকে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে মাদক পরীক্ষার ফলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উদ্বেগের পাশাপাশি উড়োজাহাজটির প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও ক্রুদের কার্যক্রমও সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য নতুন চাপ

একদিকে ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের গুরুতর ঘটনা, অন্যদিকে পাইলটের নিশ্চিত মাদক পরীক্ষার ফল এবং এখন আরও দুই পাইলটের প্রাথমিক পরীক্ষায় নন-নেগেটিভ ফল—সব মিলিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এয়ারলাইনটির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তদন্তের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা, নিশ্চিত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাইলটদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ফ্লাইট এআই-২৩৭৯-এর প্রযুক্তিগত ও মানবিক কারণের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি কারণকে ঘটনার একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া থেকে বিরত থাকাও জরুরি।

সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকোনমিক টাইমস ও অন্যান্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।