ফেরার তারিখ নেই, চরম চাপে আব্রাহাম লিংকনের নাবিকরা

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে দীর্ঘ মোতায়েনে নাবিকদের মানসিক চাপ, আত্মহানির আশঙ্কা। ২৫০ দিন টানা সমুদ্রে, নেই ফেরার নির্দিষ্ট সময়—পরিবারের অভিযোগ ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার সংকটে ভেঙে পড়ছেন নাবিকরা।

বিশ্ব ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্যের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনকে ঘিরে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণসংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে রণতরীটির ভূমিকা অব্যাহত থাকায় নির্ধারিত সময়ের পরও এর মোতায়েন কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে।

নাবিক ও মেরিন সদস্যেদের এখনো দেশে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যেই পরিবার, নাবিক ও মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে একাধিক নাবিকের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা এবং আত্মহানির চিন্তার কথা উঠে এসেছে।

একই সময়ে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, নিয়মিত বন্দরে ভেড়ার সুযোগ না থাকা, যোগাযোগ ও ডাক ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং অতীতে খাবার, পানি, লন্ড্রি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে ওঠা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনী সমানভাবে স্বীকার করেনি। নৌবাহিনীর ভাষ্য, বর্তমানে জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, কার্যকর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী ও সেবা সক্রিয় রয়েছে।

দীর্ঘ মোতায়েনের শুরু যেভাবে

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে নিয়মিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় মোতায়েনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পরিকল্পনাটি ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে রণতরীটিকে সেই অঞ্চলমুখী করা হয় এবং জানুয়ারি ২০২৬ নাগাদ এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে যায়। এরপর থেকে এটি মূলত আরব সাগর ও যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করে ইরান-সংক্রান্ত সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আব্রাহাম লিংকনের নাবিকরা ২৫০ দিন টানা সমুদ্রে অবস্থানের রেকর্ড গড়েছেন। জুলাইয়ের প্রতিবেদনে রণতরীটি টানা ২০৭ দিন সমুদ্রে থাকার মাধ্যমে মহামারিকালীন সময়ে ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের করা আগের রেকর্ড অতিক্রম করেছিল। আগস্টে সেই সময় আরও বেড়ে প্রায় ২৫০ দিনে পৌঁছেছে।

এটি শুধু দীর্ঘ মোতায়েন নয়; নিয়মিত বন্দরে ভেড়ার সুযোগের ঘাটতিই নাবিকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সাধারণত বিমানবাহী রণতরীগুলো প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বন্দরে গিয়ে রসদ সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মীদের বিশ্রাম ও মানসিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক চক্র কার্যত ভেঙে পড়েছে।

মাত্র দুটি স্বল্পমেয়াদি স্থল-সুযোগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোতায়েনের পুরো সময়ে প্রায় ৫ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সদস্য মাত্র দুটি উল্লেখযোগ্য স্থল-সুযোগ পেয়েছেন। প্রথমটি ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১১ ও ১২ তারিখে গুয়ামে। তবে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানেও অনেক নাবিক জাহাজ থেকে নামার সুযোগ পাননি। দ্বিতীয়টি ছিল ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে ওমানে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান। সেখানে রসদ পুনরায় সংগ্রহ করা হয় এবং কিছু নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাদের চলাচল একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকার মধ্যে সীমিত ছিল।

ওমানের ওই অবস্থান থেকে জাহাজে কয়েক মাস পর তাজা ফল ও সবজিসহ কিছু সরবরাহ পৌঁছায় বলে নাবিকদের বরাতে Stars and Stripes জানিয়েছে। অর্থাৎ রসদ সরবরাহের কিছু ঘাটতি পরবর্তী সময়ে আংশিকভাবে কাটিয়ে ওঠা গেলেও দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার মৌলিক সমস্যাটি থেকে যায়।

মে মাসে ফেরার কথা থাকলেও বাড়ে মোতায়েন

আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান মোতায়েন মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মে ২০২৬ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় সেই পরিকল্পনা পরিবর্তিত হয়। মোতায়েন কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এবং আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত নৌবাহিনী প্রকাশ্যে কোনো ফেরার তারিখ ঘোষণা করেনি।

পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই—কবে দেশে ফিরবেন, সেটি তারা জানেন না। দীর্ঘ মোতায়েনের সঙ্গে যখন ফেরার সময়সীমাও অনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন কর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা, পরিকল্পনা ও মানসিক প্রস্তুতির জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। এক নাবিক Stars and Stripes-কে বলেন, এখন তাদের একমাত্র চাওয়া হলো দেশে ফেরার একটি তারিখ।

সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার একাধিক ঘটনা

এই দীর্ঘ মোতায়েনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নাবিকদের আত্মহানির আশঙ্কা এবং সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার একাধিক ঘটনা। Military Times জানিয়েছে, অন্তত এক নাবিক রণতরী থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করার পর বর্তমানে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তার স্ত্রী অ্যানাবেল লোমা বলেন, বারবার মোতায়েন বাড়ানো ও অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে তার স্বামী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ঘটনার পর তিনি আশঙ্কা করছেন, বিষয়টি তার ১৩ বছরের নৌবাহিনীর চাকরির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটি পৃথক ঘটনায় দায়িত্ব পালনরত এক নাবিক তার এক সহকর্মীকে জাহাজের কিনারার দিকে যেতে দেখে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি ওই ব্যক্তিকে ধরে জাহাজের ডেকে ফিরিয়ে আনেন। পরে আরও তিনজন নাবিক সেখানে ছুটে এসে সহায়তা করেন বলে ওই নাবিকের স্ত্রী মারিয়া রদ্রিগেজ জানিয়েছেন।

Stars and Stripes-ও জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে একজন নাবিককে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়া থেকে প্রহরারত সদস্যরা থামিয়েছিলেন। পরে জাহাজজুড়ে ঘোষণার মাধ্যমে ঘটনাটি নাবিকদের জানানো হয়। তবে এসব ঘটনার সঠিক সংখ্যা নৌবাহিনী প্রকাশ করেনি।

পরিবারগুলোর বক্তব্য পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। সান ডিয়েগোতে আয়োজিত এক বৈঠকে এক স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার স্বামী তাকে এমন বার্তা পাঠিয়েছিলেন যাতে তিনি লিখেছিলেন—পরদিন যেন আর ঘুম থেকে উঠতে না হয়। আরেক অভিভাবক Stars and Stripes-কে বলেন, তার ছেলে ও তার সহকর্মীরা কেবল স্বস্তি পাওয়ার জন্য জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে বলে তিনি শুনেছেন।

পরিবারগুলোর সঙ্গে উত্তপ্ত টাউন হল বৈঠক

নাবিকদের পরিবারের উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সান ডিয়েগোতে প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য একটি টাউন হল বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাওসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। একই দিনে ভার্চুয়াল বৈঠকেও পরিবারের সদস্যরা মানসিক স্বাস্থ্য, ক্লান্তি, নিরাপত্তা, সরবরাহ ও যোগাযোগসংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরেন।

বৈঠকে পরিবারের সদস্যরা নেতৃত্বের সঙ্গে আস্থার সংকটের কথাও জানান। একজন নারী সরাসরি বলেন, নেতৃত্বের ওপর তাদের বিশ্বাস ভেঙে গেছে। পরিবারগুলোর অভিযোগ, তারা বুঝতে পারছেন যে যুদ্ধ ও দীর্ঘ দায়িত্ব সামরিক জীবনের অংশ; কিন্তু রণতরীটির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিরতির সুযোগ প্রায় না থাকায় পরিস্থিতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা অবশ্য পরিবারের উদ্বেগকে উপেক্ষা করেননি। নৌবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, ধর্মীয় পরামর্শদাতা, চিকিৎসক এবং অন্যান্য সহায়তা ব্যবস্থার কথা তারা তুলে ধরেন। আরও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী জাহাজে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও পরিবারগুলোকে জানানো হয়।

খাবার, পানি, লন্ড্রি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ

মানসিক চাপের পাশাপাশি জাহাজের জীবনযাত্রার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। নাবিক ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মোতায়েনের বিভিন্ন পর্যায়ে খাবার রেশনিং, পানির ঘাটতি, লন্ড্রি পরিষেবা বন্ধ থাকা, ডাক বিলম্ব এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সমস্যা দেখা দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ছাঁচযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট শৌচাগার, কয়েক সপ্তাহ লন্ড্রি বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না থাকা এবং সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতির অভিযোগ এসেছে। একটি খাবারের ক্ষেত্রে মাত্র আধা কাপ চাল ও দুটি টর্টিলা দেওয়ার অভিযোগও তিনি উল্লেখ করেন।

এপ্রিলেও জাহাজটির খাবার ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় কিছু ছবি ও প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে খাবারের পরিমাণ ও সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস ট্রিপোলি—দুই জাহাজেই ৩০ দিনের বেশি খাবারের মজুত ছিল।

অর্থাৎ, এখানে অভিযোগ ও সরকারি বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পরিবার ও নাবিকদের অভিজ্ঞতায় খাবারের ধরন, তাজা খাবার, পানি ও দৈনন্দিন সুবিধা নিয়ে সমস্যা ছিল; অন্যদিকে নৌবাহিনীর হিসাব বলছে, জাহাজে সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও মৌলিক সুবিধা বজায় ছিল। এই দুই বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ যাচাইয়ের জন্য কংগ্রেসের পর্যবেক্ষণ বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের ঘাটতি

নাবিকদের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কাজের সময়। পরিবার ও নাবিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক সদস্য দীর্ঘ সময় কাজ করছেন এবং পর্যাপ্ত অবসর বা বিশ্রাম পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটানা যুদ্ধ-সম্পর্কিত দায়িত্ব।

নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আব্রাহাম লিংকনের নাবিকরা টানা ৪০ দিন যুদ্ধ-অভিযান পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। এই ধরনের দায়িত্বের সঙ্গে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান, ঘুম ও বিশ্রামের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের সঙ্গে অনিয়মিত যোগাযোগ মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও মোতায়েনরত নৌসদস্যদের মানসিক চাপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত গবেষণায় প্রয়োজনের সময় বিশ্রাম না পাওয়া, পর্যাপ্ত মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবকে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও সমস্যা

দীর্ঘ মোতায়েনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সহায়তা। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে বলে পরিবার ও নাবিকরা জানিয়েছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু সময় ডাক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে।

একজন নাবিকের পরিবারের সদস্য জানান, আট মাস ধরে নিয়মিত যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আরেক পরিবারের সদস্য বলেন, তার মা যখন যোগাযোগ করতে পারেন, তখন তার কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায় যে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

পরিবারগুলোর কাছে এই অনিশ্চয়তা শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ঘটনাকেও প্রভাবিত করছে। কেউ জানেন না তাদের প্রিয়জন স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, জন্মদিন কিংবা অন্যান্য পারিবারিক উপলক্ষে দেশে থাকতে পারবেন কি না।

নৌবাহিনীর বক্তব্য: পরিস্থিতি কঠিন

সমালোচনার মুখে মার্কিন নৌবাহিনী বলেছে, দীর্ঘ মোতায়েন নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে—এ বিষয়টি তারা স্বীকার করে। একই সঙ্গে নৌবাহিনী জানিয়েছে, প্রতিটি নাবিকের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ তাদের অগ্রাধিকার।

নৌবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, আব্রাহাম লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা, ধর্মীয় পরামর্শদাতা, চিকিৎসক ও অন্যান্য সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। নেতৃত্ব নিয়মিতভাবে নাবিকদের মানসিক প্রস্তুতি ও সুস্থতা মূল্যায়ন করছে।

তবে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া বা আত্মহানির চেষ্টার সংখ্যা নিয়ে নৌবাহিনী কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেয়নি। বরং Guardian-এর প্রশ্নের জবাবে একজন নৌবাহিনী কর্মকর্তা বলেন, কমান্ডের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার প্রতিবেদনে কোনো বৃদ্ধি শনাক্ত করা হয়নি।

সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও নৌবাহিনী বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত সরবরাহকেন্দ্রগুলো ব্যাহত হওয়ায় রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী এবং পরে ডাক ব্যবস্থাকে। নৌবাহিনীর সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজে বিশুদ্ধ পানির ধারাবাহিক সরবরাহ, কার্যকর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রতিটি খাবারে দুটি প্রোটিনের বিকল্প রয়েছে।

সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত, কিন্তু ফেরার তারিখ নেই

পরিবারগুলোর সঙ্গে বৈঠকে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে আব্রাহাম লিংকনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন ঠিক কবে দেশে ফিরবে, তা প্রকাশ করেননি।

ফলে নাবিক ও পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘ফেরার দিন কবে’—এর উত্তর এখনো অজানা। দীর্ঘ মোতায়েনের মধ্যে এই অনিশ্চয়তাই মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে পরিবারগুলোর বক্তব্য।

কংগ্রেসে নজরদারি ও জবাবদিহির দাবি

জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাইক লেভিন দীর্ঘদিন ধরে খাবার ও জীবনযাত্রার অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো বলেছেন, আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ছে।

সিনেট পর্যায়েও রণতরীটির দীর্ঘ মোতায়েন, সরবরাহ, পানি ও প্লাম্বিং ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নের মূল কেন্দ্র হলো—যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কতটা দীর্ঘ সময় একটি বিমানবাহী রণতরীর কর্মীদের নিয়মিত স্থল-বিরতি ছাড়া সমুদ্রে রাখা নিরাপদ এবং টেকসই।

শুধু একটি জাহাজের সমস্যা নয়, বড় সামরিক বাস্তবতার প্রতিফলন

আব্রাহাম লিংকনের ঘটনা শুধু একটি বিমানবাহী রণতরীর জীবনযাত্রার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের একটি বড় মানবিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে।

বিমানবাহী রণতরীর মতো একটি যুদ্ধজাহাজকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে রাখা হলে শুধু জ্বালানি, অস্ত্র, খাদ্য ও গোলাবারুদের সরবরাহ নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একই সঙ্গে কর্মীদের ঘুম, বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবার-যোগাযোগ, পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশও নিশ্চিত করতে হয়। আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কোনো স্বাভাবিক বন্দরের বিরতি না থাকায় এসব মানবিক উপাদানই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতায় আব্রাহাম লিংকন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রণতরীটির বিমানগুলো যুদ্ধ-সম্পর্কিত অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং এটি আরব সাগরে অবস্থান করে আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকাশিত সামরিক পর্যবেক্ষণেও আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে অপারেশন এপিক ফিউরির সমর্থনে আরব সাগরে অবস্থান করতে দেখা যায়।

কিন্তু একই সঙ্গে ২৫০ দিনের টানা সমুদ্রযাত্রা, প্রায় নয় মাসের মোতায়েন, মাত্র সীমিত স্থল-বিরতি এবং ফেরার তারিখের অনিশ্চয়তা নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। পরিবারগুলোর বক্তব্যে আত্মহানির চিন্তা ও সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনা উঠে আসা বিষয়টিকে আর কেবল ‘কঠিন মোতায়েন’ হিসেবে দেখার সুযোগ রাখছে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নৌবাহিনী আত্মহানির প্রতিবেদনে কোনো বৃদ্ধি শনাক্ত করার কথা অস্বীকার করলেও একই সময়ে পরিবার, নাবিক এবং সামরিকবিষয়ক একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম অন্তত কয়েকটি গুরুতর ঘটনার কথা জানিয়েছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা, ঝুঁকির মাত্রা এবং মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণে আরও স্বচ্ছ তথ্য ও স্বাধীন নজরদারি প্রয়োজন হতে পারে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়; এটি নাবিকদের সহনশীলতা, সামরিক নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং যুদ্ধকালীন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা। প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্যকে নিয়ে রণতরীটি যখন টানা ২৫০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান করছে এবং দেশে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই, তখন পরিবারের উদ্বেগ ও আত্মহানির আশঙ্কা সামরিক অভিযানের মানবিক মূল্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নৌবাহিনী বলছে, জাহাজটি মিশন-সক্ষম এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ব্যবস্থা চালু আছে। পরিবার ও কিছু নাবিক বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি আরও কঠিন। এই দুই অবস্থানের মধ্যকার ব্যবধানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা যতই দীর্ঘ হোক, একটি বাহিনীর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত তার সদস্যদের শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থার ওপরও নির্ভর করে।

সূত্র: ১৩ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত Guardian, Stars and Stripes, Military Times এবং মার্কিন নৌবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রতিবেদন।