তরতুস বন্দরের বাণিজ্যিক সুবিধা সিরিয়ার হাতে দিচ্ছে রাশিয়া

১৮ মাসের আলোচনার পর সমঝোতা; তিন মাসের মধ্যে বন্দর ও বিমানঘাঁটির বেসামরিক স্থাপনা হস্তান্তরের লক্ষ্য, যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রুশ সামরিক স্থাপনা রূপান্তরের পরিকল্পনা।

বিশ্ব ডেস্ক: সিরিয়ার তরতুস বন্দরের বাণিজ্যিক সুবিধা সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে রাশিয়া ও সিরিয়া চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছে। ১৮ মাসের ধারাবাহিক আলোচনার পর দুই দেশের মধ্যে এ সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা তরতুস বন্দরের বাণিজ্যিক অংশ—বিশেষ করে চতুর্থ বার্থ এবং এর আশপাশের গুদাম ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা—সিরিয়ার বেসামরিক প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সিরিয়ার সাধারণ বন্দর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। একই সময়ে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হ্মেইমিম বিমানঘাঁটি ও তরতুস নৌঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, তরতুস বন্দরের চতুর্থ বাণিজ্যিক বার্থসহ সংশ্লিষ্ট বেসামরিক সুবিধাগুলো ধাপে ধাপে সিরিয়ার বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে নেওয়া হবে। একইভাবে হ্মেইমিম বিমানঘাঁটির বেসামরিক সুবিধাগুলোও সিরিয়ার প্রশাসনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সামরিক সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এসব স্থাপনার ব্যবহার নির্ধারণ করা হবে।

সিরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো রূপান্তর ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

রোববার (৯ আগস্ট) সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি লাতাকিয়া বিমানবন্দর ও তরতুস বন্দর পরিদর্শন করেন। তাঁর এ সফরের মধ্যেই বন্দর ও বিমানঘাঁটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সমঝোতার বিষয়টি সামনে আসে।

আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন সমীকরণ

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আসাদ সরকারের আমলে তরতুস ছিল ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার একমাত্র স্থায়ী নৌঘাঁটি। একই সময়ে হ্মেইমিম ছিল সিরিয়ায় রাশিয়ার প্রধান বিমানঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর সামরিক উপস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন সিরীয় নেতৃত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে। তবে একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে নতুন কাঠামোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখার পথও খোঁজা হয়।

অন্যদিকে রাশিয়াও সিরিয়া থেকে তার সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে সীমিত পরিসরে প্রভাব ও লজিস্টিক সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। যৌথ প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রস্তাবকে সেই সমঝোতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাড়বে তরতুস বন্দরের সক্ষমতা

তরতুস বন্দরের চতুর্থ বার্থ এ সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বার্থটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৩০ মিটার। একসঙ্গে তিনটি বড় জাহাজ—প্রতিটি সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার—নোঙর করার সক্ষমতা রয়েছে।

সিরীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই বার্থ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সরাসরি বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে এলে বন্দরের সামগ্রিক ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং মালবাহী কার্যক্রম আরও দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে গুদাম ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো বাণিজ্যিক ব্যবহারের আওতায় আসায় বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়তে পারে।

রাশিয়ার জন্যও থাকছে কৌশলগত সুবিধা

বিশ্লেষকদের একাংশ রাশিয়া-সিরিয়ার নতুন সমঝোতাকে উভয় পক্ষের জন্য একটি ‘মুখরক্ষার’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে সিরিয়া তার উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে। একই সময়ে রাশিয়াও যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে সিরিয়ায় একটি সীমিত উপস্থিতি ধরে রাখার সুযোগ পাচ্ছে।

এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে রাশিয়ার উপস্থিতি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ করছে না। ফলে এটি সরাসরি রুশ সামরিক প্রত্যাহারের পরিবর্তে উপস্থিতির ধরন ও কাঠামো পরিবর্তনের একটি ব্যবস্থা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

তরতুস বন্দর ও হ্মেইমিম বিমানঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরে রুশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা এবং সিরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে সামরিক সরবরাহ ও অভিযান পরিচালনায় তরতুস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নতুন সমঝোতার ফলে এসব স্থাপনার ব্যবহারে পরিবর্তন এলেও সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার পরিবর্তে নতুন কাঠামোয় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সমঝোতাকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অবকাঠামোর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার জন্য এটি সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি কৌশলগত সমঝোতা। ফলে তরতুস ও হ্মেইমিম ঘিরে নতুন ব্যবস্থা শুধু সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক উপস্থিতির ধরনও নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: সিরিয়ান আরব নিউজ এজেন্সি, রয়টার্স, সিরিয়ার সাধারণ বন্দর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং Russia’s Pivot to Asia।