স্থলপথে নতুন বাণিজ্য করিডোর গড়ছে রাশিয়া

সমুদ্রপথের ঝুঁকি এড়িয়ে নতুন বাণিজ্য করিডোর, ভারত মহাসাগর থেকে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে মস্কোর তৎপরতা।

বিশ্ব ডেস্ক: রাশিয়া তার বিশাল মহাদেশীয় ভূগোলকে নতুন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তরের লক্ষ্যে এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথজুড়ে রেল যোগাযোগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা সম্প্রসারণ করছে। দেশটির রেল কৌশল এখন আর শুধু ইউরোপ, সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল কিংবা চীনের সঙ্গে যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নেই; মধ্য এশিয়া, ইরান, আজারবাইজান, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত এর পরিধি বাড়ছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা রুশ রেলওয়ে—আরজেডডি—কেন্দ্র করে নেওয়া এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মালবাহী পরিবহন বৃদ্ধি, সীমান্ত সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটাল পরিবহনব্যবস্থা, বৈদ্যুতিন তথ্য বিনিময়, রেল প্রযুক্তি রপ্তানি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিল্প সহযোগিতা। সামগ্রিকভাবে মস্কো সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলভিত্তিক বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তুলতে চাইছে।

উত্তর-দক্ষিণ করিডোরে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি

রাশিয়ার এই কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর—আইএনএসটিসি। প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর রাশিয়া, আজারবাইজান, ইরান হয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।

২০২৬ সালের ৩ ও ৪ জুলাই মস্কোতে রাশিয়া, ইরান ও আজারবাইজানের শীর্ষ রেল কর্মকর্তাদের বৈঠকে করিডোরের পশ্চিম শাখা উন্নয়ন, মালবাহী পরিবহন বৃদ্ধি, পথের দক্ষতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবহন করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং বৈদ্যুতিন তথ্য বিনিময়ের মান একীভূত করার বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা হয়। এর ফলে শুল্ক ও পণ্য পরিবহনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং কাগজভিত্তিক নথিপত্রের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

করিডোরটির বাস্তব সম্ভাবনার প্রমাণও মিলছে পণ্য পরিবহনের পরিসংখ্যানে। ২০২৬ সালের জুনে আস্তারা সীমান্ত দিয়ে ৪৭ হাজার ৫০০ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দক্ষিণমুখী পণ্য পরিবহন প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে রাশিয়া থেকে ইরানে শস্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় চার গুণেরও বেশি হয়েছে।

আজারবাইজানের অংশে উত্তর-দক্ষিণ রেলপথের দৈর্ঘ্য ৫১১ কিলোমিটার। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর হিসাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর ও উত্তর ইউরোপের মধ্যে প্রচলিত সমুদ্রপথে যেখানে প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে, সেখানে এই করিডোর কার্যকর হলে তা প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় শাখায় বছরে ১৫ মিলিয়ন টন বা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টিইইউ পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাশত-আস্তারা—করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত সংযোগ

আইএনএসটিসির পশ্চিম শাখার পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতার ক্ষেত্রে ইরানের রাশত-আস্তারা রেলপথকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত সংযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মস্কো বৈঠকের সময় ইরানের রেলওয়ে প্রধান জব্বার আলী জাকারি রাশিয়ার উপপরিবহনমন্ত্রী দিমিত্রি জভেরেভের সঙ্গে রাশত-আস্তারা প্রকল্পের অগ্রগতি এবং উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

এই রেলপথ সম্পন্ন হলে রাশিয়া-আজারবাইজান-ইরানভিত্তিক পশ্চিম শাখা আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে রাশিয়া থেকে ইরান হয়ে পারস্য উপসাগর এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

ভারত মহাসাগরের দিকে নতুন রেলপথের ভাবনা

রাশিয়ার দক্ষিণমুখী পরিকল্পনার আরও উচ্চাভিলাষী অংশ হলো ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুল্লিন জানিয়েছেন, বসফরাস ও হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথের ঝুঁকি এড়াতে ভারত মহাসাগরের দিকে বিকল্প রেল সংযোগ বিবেচনা করা উচিত।

সম্ভাব্য একটি পথ হিসেবে তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারতের দিকে যাওয়ার রুটের কথা বলা হয়েছে। তবে এটি এখনো প্রস্তাব ও অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে; কোনো নির্দিষ্ট রুট, নির্মাণকাল বা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানে বিপুল অবকাঠামো ব্যয়ের বিষয়টি এই পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনের সঙ্গে রেল বাণিজ্যে নতুন গতি

রাশিয়ার পূর্বমুখী রেল কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি ৭০ লাখ টনে পৌঁছায়, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালে দুই দেশের রেলপথে পণ্য পরিবহন আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল।

এই প্রবাহ আরও বাড়াতে রাশিয়া ও চীন জাবাইকালস্ক-মানঝৌলি সীমান্তে দ্বিতীয় রেলপথ নির্মাণে আন্তঃসরকারি চুক্তি করেছে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে সীমান্ত পয়েন্টটির পরিবহন সক্ষমতা বছরে আরও ১ কোটি ১০ লাখ টন বাড়াতে পারে এবং দিনে প্রায় ৫০ জোড়া মালবাহী ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি করবে।

একই সঙ্গে হেইহে-রাশিয়ার ব্লাগোভেশচেনস্ক সংযোগে নতুন রেলপথের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমুর নদীর ওপর বিদ্যমান সেতুতে সড়ক পরিবহনের চাপ বাড়ায় নতুন রেল সংযোগ হলে চীনের উৎপাদনকেন্দ্র, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য এবং ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে।

মঙ্গোলিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান

মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ট্রান্স-মঙ্গোলিয়া রেলপথ ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। তবে একক রেলপথটি সক্ষমতার কাছাকাছি চলে যাওয়ায় উলানবাটার রেলওয়ের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৫ কোটি টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

মধ্য এশিয়ায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার সহযোগিতা এখন শুধু পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ নেই; সীমান্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লজিস্টিকস, রেল অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের সঙ্গে সংযোগ তৈরিও এর অংশ।

আফগানিস্তান এই পরিকল্পনার সবচেয়ে জটিল কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যে কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ রয়েছে। উজবেকিস্তানের সঙ্গে হায়রাতন-মাজার-ই-শরিফ, তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে তোরঘুন্দি ও আকিনা এবং ইরানের সঙ্গে খাফ-হেরাত সংযোগ নিয়ে কাজ চলছে।

আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার রেলপথকে পাকিস্তান ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ট্রান্স-আফগান রুট বছরে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫০ লাখ টন রুশ পণ্য পরিবহনে সক্ষম হতে পারে। তবে নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অর্থায়ন এবং একাধিক দেশের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা এই পথকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেল প্রযুক্তি রপ্তানি

রাশিয়ার রেল কৌশল এখন শুধু রেললাইন বা লোকোমোটিভ রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নেই। থাইল্যান্ডের সঙ্গে সাম্প্রতিক সহযোগিতা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

৫ আগস্ট ২০২৬ থাইল্যান্ডের পরিবহনমন্ত্রী ফিফাত রাতচাকিতপ্রাকানসহ দেশটির কর্মকর্তারা মস্কোতে রুশ রেল গবেষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে রেল প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। থাইল্যান্ড রুশ রেল মানদণ্ডের কিছু অংশ গ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং রাশিয়ার ১৯টি পরিবহন কলেজের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিনিময়ের পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে।

বিশেষভাবে থাইল্যান্ডে স্থানীয়ভাবে রেলচাকার উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ, রাশিয়া শুধু যন্ত্রপাতি বিক্রি নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উৎপাদন, প্রকৌশল, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় যুক্ত করতে চাইছে। একই দিনে দুই দেশ রেল, বিমান, নৌপরিবহন, বুদ্ধিমান পরিবহনব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, অবকাঠামো, কর্মী প্রশিক্ষণ, গবেষণা, উপগ্রহ প্রযুক্তি এবং পরিবহন নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার একটি অভিপ্রায়পত্রও সই করে।

ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য অংশীদারের ক্ষেত্রেও রাশিয়া রেল অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মালবাহী পরিবহন সহযোগিতার সুযোগ বাড়াচ্ছে। একই ধারায় কিউবা ও সার্বিয়ার মতো দেশেও রুশ রেল প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উপস্থিতি বজায় রয়েছে।

সার্বিয়া ও কিউবায় ভিন্ন ধরনের রেল কূটনীতি

ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার রেল পরিবহন কমলেও সার্বিয়া ব্যতিক্রম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিয়ায় রুশ রেলওয়ে আধুনিকায়ন প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে। বেলগ্রেডের কাছে একটি সমন্বিত রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের প্রকল্পে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ইউরো ব্যয় হচ্ছে এবং ২০২৬ সালে প্রকল্পটির প্রায় ৮৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রেল নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কিউবার রেল ব্যবস্থায় রুশ প্রযুক্তির পুরোনো উপস্থিতি এখন নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করেছে। দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ লোকোমোটিভ ও রেলওয়ে কোচ রুশ উৎসের হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, সংস্কার ও আধুনিকায়নে রাশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুযোগ রয়েছে।

বেলারুশ থেকে মধ্য এশিয়ায় নতুন মালবাহী পথ

রাশিয়ার মধ্যস্থতায় বেলারুশও নতুন স্থলভিত্তিক বাণিজ্যপথে যুক্ত হচ্ছে। ৩ আগস্ট ‘স্লাভিক ক্যারাভান’ প্রকল্পের আওতায় বেলারুশ থেকে দ্বিতীয় মালবাহী ট্রেনটি রাশিয়া, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার বাজারের উদ্দেশে যাত্রা করে। ট্রেনটিতে ৪ হাজার টনের বেশি রপ্তানি পণ্য ছিল। এর আগে ৩০ জুলাই প্রথম ট্রেনটি যাত্রা করেছিল।

আর্থিক চাপের মধ্যেও রেলের সম্প্রসারণ

রাশিয়ার রেল কূটনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অর্থায়ন। রুশ রেলওয়ের ২০২৫ সালের আয় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন রুবেলে দাঁড়ায়, যা প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। পরিচালন মুনাফা বেড়ে ৫৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন রুবেল এবং ইবিটডা ১ দশমিক ০৬ ট্রিলিয়ন রুবেলে পৌঁছায়।

কিন্তু ঋণের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে আর্থিক ব্যয় দাঁড়ায় ৫৩৪ দশমিক ১ বিলিয়ন রুবেল। ফলে নিট মুনাফা ৫০ দশমিক ৭ বিলিয়ন রুবেল থেকে কমে মাত্র ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন রুবেলে নেমে আসে। নিট ঋণ ও ইবিটডার অনুপাত দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩৭ গুণ, যেখানে সর্বোচ্চ সীমা ৩ দশমিক ৫ গুণ।

২০২৬ সালে রুশ রেলওয়ে তার বিনিয়োগ কর্মসূচিও ২০ শতাংশ কমিয়েছে। এর আগের বছরও ২০২৪ সালের প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন রুবেলের বিনিয়োগ কর্মসূচি থেকে ৪০ শতাংশ কমানো হয়েছিল। প্রায় ৮৫ হাজার কিলোমিটার রেলপথ এবং রাশিয়ার ৮৯টি অঞ্চলের মধ্যে ৭৭টি অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অবকাঠামোগত ব্যয় বড় চাপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতিতে রুশ রেলওয়ে নিয়মিত পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে ‘শিপ-অর-পে’ ধরনের ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা দেবেন এবং পণ্য পুরোপুরি পরিবহন না হলেও অর্থ পরিশোধ করবেন।

শস্য রপ্তানিই হয়ে উঠছে নতুন চালিকাশক্তি

রাশিয়ার রেল মালবাহী ব্যবস্থায় কৃষিপণ্য, বিশেষ করে শস্যের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে শস্য পরিবহন ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। শিল্পখাতের কিছু ঐতিহ্যবাহী পণ্য পরিবহন দুর্বল হলেও কৃষিপণ্য রেলপথে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস হয়ে উঠছে।

উত্তর-দক্ষিণ করিডোর এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া থেকে ইরান এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার দিকে শস্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মস্কো মিসর ও ওমানের সঙ্গে শস্য বিতরণ ও লজিস্টিকস কেন্দ্র গঠনের বিষয়েও আলোচনা করছে। একই সঙ্গে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে একটি শস্য বিনিময়ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে।

সমুদ্রপথে বাধা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ঝুঁকি বাড়ায় রাশিয়া বিকল্প রেলপথ ও বন্দর ব্যবহারের দিকেও যাচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন রুবেল বা ১২ কোটি ২০ লাখ ডলারের রেল সহায়তা প্যাকেজের প্রস্তাব রয়েছে, যার মাধ্যমে রোস্তভ অঞ্চল থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনের বিকল্প রেলপথ এবং সাইবেরিয়া থেকে দূরপ্রাচ্যের বন্দরমুখী পরিবহনকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইউরোপ থেকে সরে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর দিকে

রুশ রেলওয়ের আন্তর্জাতিক পরিবহনের ৯৩ শতাংশের বেশি এখন তথাকথিত বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত। চীনের সঙ্গে রেল পরিবহন ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বেলারুশের সঙ্গে ৩ শতাংশ বেড়েছে। ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও পরিবহন বাড়ছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে রেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফিনল্যান্ডের সঙ্গে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং এস্তোনিয়ার সঙ্গে ৪২ শতাংশ পতন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া তার রেল বাণিজ্যকে চীন, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, মধ্য এশিয়া, ইরান এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট করছে।

অবকাঠামোর চেয়ে বড় হচ্ছে ‘রেল কূটনীতি’

রাশিয়ার বর্তমান কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—এটি শুধু রেললাইন নির্মাণের প্রকল্প নয়। মস্কো একই সঙ্গে রেলপথ, লোকোমোটিভ, সংকেতব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল পণ্য নথি, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, মানদণ্ড, ইজারা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে রপ্তানিযোগ্য একটি কাঠামোয় পরিণত করতে চাইছে।

থাইল্যান্ডে প্রশিক্ষণ ও মানদণ্ড, সার্বিয়ায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ, তাজিকিস্তানে রেলযান ও ইজারা, কিউবায় রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন, ইরান-আজারবাইজানে করিডোর সমন্বয় এবং ভারতকে সম্ভাব্য বৃহৎ বাজার হিসেবে দেখা—সব মিলিয়ে রাশিয়া একটি বিস্তৃত রেলভিত্তিক বাণিজ্যিক ও শিল্প কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

সামনে বড় পরীক্ষা

তবে রাশিয়ার এই রেল কৌশল এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আলোচনায় আসা বহু প্রকল্প এখনো সমঝোতা, সম্ভাব্যতা যাচাই, চুক্তি আলোচনা অথবা প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব করিডোরে নিয়মিত ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পণ্য পরিবহন কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।

আইএনএসটিসিতে ইতোমধ্যে বাস্তব অগ্রগতির কিছু পরিমাপযোগ্য ফল দেখা যাচ্ছে—আস্তারা সীমান্তে জুনে পণ্য পরিবহন ৫০ শতাংশ বেড়েছে, বছরের প্রথমার্ধে দক্ষিণমুখী চালান ২৭ শতাংশ বেড়েছে এবং ইরানে রুশ শস্য রপ্তানি চার গুণের বেশি হয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া-পাকিস্তান রুটে নিয়মিত পরিবহনের জন্য রাশিয়া, বেলারুশ, মধ্য এশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান থেকে পর্যাপ্ত পণ্য সংগ্রহের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। ভারত মহাসাগরমুখী রেল সংযোগে অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ আরও বড়। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্যতা যাচাই। আফগানিস্তানে নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। একই সঙ্গে রুশ রেলওয়েকেও ঋণ, বিনিয়োগ ও পণ্য পরিবহনের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া একটি নির্দিষ্ট রেল করিডোরের ওপর নির্ভর না করে একাধিক দিকের বিকল্প পথ তৈরি করছে। পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণ করিডোর, পূর্বে চীন, দক্ষিণে মধ্য এশিয়া-ইরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান, আর দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুকে একটি বৃহত্তর ইউরেশীয় নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই নেটওয়ার্ক সফল হলে রাশিয়ার রেলপথ শুধু পরিবহন অবকাঠামো হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিল্প, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভূ-অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমা বাজারের বিকল্প হিসেবে চীন, মধ্য এশিয়া, ইরান, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংযোগ তখন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

অর্থাৎ মস্কোর লক্ষ্য কেবল পশ্চিমা রুটের বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি বহুমুখী স্থলভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সমুদ্রপথ, সীমান্ত বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কোনো একটি রুট বাধাগ্রস্ত হলেও অন্য রুট দিয়ে পণ্য প্রবাহ চালু রাখা যায়। এ কারণেই রাশিয়ার বর্তমান রেল কৌশলকে একটি একক করিডোরের প্রকল্প না দেখে ক্রমবর্ধমান বহুমুখী ইউরেশীয় রেল নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।