লোহিত সাগর সুরক্ষায় ১৪ দেশের জোটে বাংলাদেশ: কৌশলগত স্বার্থ কি

সৌদি আরবের নেতৃত্বে লোহিত সাগর সুরক্ষায় বহুজাতিক নৌ-জোট: বাংলাদেশের অংশগ্রহণের কৌশলগত তাৎপর্য।
টুইট প্রতিবেদক: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ এবং লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষায় সৌদি আরব ৩০ জুলাই ২০২৬ ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত এ বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ যুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জোটটির মূল লক্ষ্য হবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি কমানো এবং সম্ভাব্য হামলা বা নৌ-হুমকি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে, জোটের মূল লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ পথ সুরক্ষিত রাখা এবং যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। ৫১টি দেশ ও সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানানোর পর ৪৩টির প্রতিনিধি রিয়াদে বৈঠকে অংশ নেন। এর মধ্যে ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে। সৌদি আরবকে নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর, যৌথ কমান্ড ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার সৌদি আরবে স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং নাইজেরিয়া বা কোমোরোস (কিছু প্রতিবেদনে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়)। বাংলাদেশের পক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান বৈঠকে অংশ নেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।e56f2e
বাংলাদেশের যোগদানের কারণ কি
বিবিসি বাংলাসহ আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত। বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার (সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক), বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। হুথিদের অবরোধ ও হামলার ফলে এই রুটও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, এটি সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার অংশ এবং হুথি হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে; ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের অবস্থান।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, জোটে যোগদানের ফলে ইরান এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। অন্যদিকে, এতে বিরত থাকলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়ও জড়িত। জোটের সনদ, নিয়ম-কানুন এবং বাংলাদেশের নির্দিষ্ট অবদান (জাহাজ, কর্মী বা অন্যান্য সহায়তা) এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
এই নৌ-জোট গঠনের কয়েক দিন পর ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় পৃথক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে এক দেশের ওপর আক্রমণকে সকলের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করার ধারা রয়েছে। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের এই উদ্যোগ কৌশলী। এটি একদিকে যৌথ দায়িত্বের নীতি তুলে ধরে, অন্যদিকে সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থানে শক্তিশালী করে। জোট উন্মুক্ত এবং অন্যান্য দেশও যোগ দিতে পারবে। ইতিমধ্যে কমান্ডার হিসেবে সৌদি নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, শ্রমবাজার স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর বাস্তবায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, আরব নিউজ, বিবিসি বাংলা (সজল দাস), আল জাজিরা, দি ডিপ্লোম্যাট, প্রোথম আলো ইংরেজি সংস্করণ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম (জুলাই-আগস্ট ২০২৬)।






