পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি যে ১০ রাষ্ট্রপতি

হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সংকট ও পদত্যাগে বারবার ব্যাহত হয়েছে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল
টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মিলিয়ে ১৮ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তাঁদের মধ্যে ১০ জনই নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং গণআন্দোলনের মতো নানা ঘটনায় বারবার ব্যাহত হয়েছে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল।
সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করায় পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারা রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় নতুন করে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর একটি অংশের হাতে নিহত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তবে একই বছরের নভেম্বরে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন আবদুস সাত্তার। পরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি হলেও ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি করা হয় বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে। পরে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।
এরশাদের পদত্যাগের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেন। পরে ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনর্বহালের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর মেয়াদ শেষে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি হন সাহাবুদ্দীন আহমদ, যিনি পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
২০০১ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে বিএনপির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০০২ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
একই বছর রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে ২০০৯ সালে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
২০১৩ সালের ২০ মার্চ রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মারা যান। বাংলাদেশের ইতিহাসে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়া একমাত্র রাষ্ট্রপতি তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে পরে টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তাঁর পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত ২৪ জুলাই ২০২৬ তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।






