শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে আপসহীন সিজেপি: অনশনে অনড় সোনম ওয়াংচুক

ভারতে উত্তপ্ত শিক্ষা আন্দোলন। ১০ এফআইআর, প্রায় ৪০০ অভিযুক্ত; যন্তর মন্তরে সংঘর্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতি, দাবি না মানলে আন্দোলন আরও জোরদারের হুঁশিয়ারি।
টুইট ডেস্ক: ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে কোনো আপস না করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। একইসঙ্গে লাদাখের পরিবেশবাদী নেতা সোনম ওয়াংচুক তার অনির্দিষ্টকালের অনশন অব্যাহত রাখার শর্ত জানিয়েছেন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বুধবার বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই তাদের প্রধান দাবি এবং এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন কোনোভাবেই থামবে না। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সরকার যদি দমন-পীড়নের পথেও এগোয়, তবুও আন্দোলনকারীরা পিছু হটবে না।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, “আমাদের আন্দোলনের শক্তি শান্তি ও অহিংসায়। সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যেও আমাদের সমর্থকেরা যে ধৈর্য, সাহস ও সংযম দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, সোনম ওয়াংচুকের অনশন কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া হবে না।”
দিনভর সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে সোনম ওয়াংচুকের একাধিকবার আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। উভয় পক্ষই একমত হয়েছেন যে আন্দোলন অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পদ্ধতিতে চালিয়ে যেতে হবে।
এদিকে সোনম ওয়াংচুক বুধবার তার অনশন প্রত্যাহারের জন্য স্পষ্ট শর্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বা প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—কেন্দ্রীয় সরকার যদি এমন নিঃশর্ত নিশ্চয়তা দেয়, তবেই তিনি অনশন ভাঙবেন। অন্যথায় অনশন অব্যাহত থাকবে।
চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। দিল্লি পুলিশ ইতোমধ্যে ১০টি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় বেআইনি সমাবেশ এবং জারি করা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রায় ৪০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এসব মামলা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একইসঙ্গে মুম্বইতেও সিজেপির সমর্থনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ১৩টি মামলা দায়ের করেছে স্থানীয় পুলিশ।
বুধবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দিল্লি পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ও দিল্লি পুলিশ সীমিত বলপ্রয়োগ করে এবং টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়মসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ। এসব ইস্যুতে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই ছাত্র-যুবসমাজ রাস্তায় নেমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকলে তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে বিরোধী দলগুলোও এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনকে একটি নৈতিক উচ্চতা দিয়েছে। লাদাখ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি এখন দিল্লি, মুম্বইসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৃহত্তর জনসমর্থন পাচ্ছে।
সিজেপি নেতৃত্ব সতর্ক করে দিয়েছে, দাবি আদায় না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। অন্যদিকে সরকার এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা সমঝোতার ইঙ্গিত দেয়নি।
সব মিলিয়ে ভারতের শিক্ষা আন্দোলন এখন এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের অবস্থানের ওপর।
ভারতে এই আন্দোলন সরকারকে সংস্কারের দিকে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু সহিংসতা বা দমন বিরোধীদের হাত শক্ত করবে। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দিয়েছে, তবে সংঘাতের ঝুঁকিও বহন করছে।
তথ্য ও সূত্র: সংগৃহিত






