বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির পথে: ৭০% এলাকা এখনো জলাবদ্ধ

৫১৮ মিমি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জেলা; ৭ জনের মৃত্যু, ২৫৮২ জন আশ্রয়কেন্দ্রে—ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত।
বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবানের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসনের প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে পানি নামতে শুরু করায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস এ তথ্য জানান। এসময় পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, পৌর প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মমতা আফরিনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক জানান, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বর্তমানে পানি বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, জেলায় এ পর্যন্ত ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১১টি বড় আকারের। ভূমিধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সড়ক বিভাগের সহায়তায় সেগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে। লামা উপজেলায় ভূমিধসে ৫ জন এবং পানিতে ডুবে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৬১ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক এবং ৯০ কিলোমিটার স্থানীয় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪টি ব্রিজ ও কালভার্টের মধ্যে একটি চালু করা গেলেও বাকি তিনটির মেরামত কাজ চলছে।
বর্তমানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে ২৫৮২ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৫০০। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা লামা পৌরসভা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলা।
কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাবে ২১০৪ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৫৩২৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে জানানো হয়, সরকারিভাবে ৪০০ টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ৮৫৬০ ব্যাগ ত্রাণ ও ৮৭৫ প্যাকেট শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজারের বেশি দুর্গত মানুষকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
এছাড়া থানচি ও রুমায় আটকে পড়া পর্যটকদের অধিকাংশকে উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ আমিয়াখুম এলাকায় আটকা পড়া ৪ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিক্যাল টিম গঠন এবং পর্যাপ্ত ওষুধ ও সাপের বিষ প্রতিষেধক মজুদ রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, আগামী ১-২ দিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষদের নিজ নিজ ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের জন্য খাদ্য সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতে টিন বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ি এলাকায় উপযোগী গৃহ নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং শহরের পানি নিষ্কাশনে মাকসি খাল সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।






