পাহাড় কেটে বাস, বর্ষায় মৃত্যুর অপেক্ষা: বান্দরবানে নীরব আতঙ্ক

বর্ষায় পাহাড়ধসের ছায়ায় ৫ হাজার ৭৫৬ পরিবার। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস, নেই স্থায়ী পুনর্বাসন; প্রতি মৌসুমেই বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা।

বান্দরবান প্রতিনিধি: টানা বর্ষণের শব্দে বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে স্বস্তি নয়, বরং আতঙ্কই বাড়ে। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বসবাসকারী হাজারো পরিবারের রাত কাটে অনিশ্চয়তায়। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নরম হয়ে পড়া মাটি ধসে পড়ে মুহূর্তে ভেঙে দিতে পারে ঘরবাড়ি, কেড়ে নিতে পারে প্রাণ।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বান্দরবানের সাত উপজেলায় অন্তত ৫ হাজার ৭৫৬টি পরিবার এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। অথচ এসব পরিবারের জন্য এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো স্থায়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা।

ঝুঁকির মধ্যে প্রতিদিনের জীবন

প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। দারিদ্র্য ও সমতল জমির অভাবে বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালেই বসতি গড়ে তোলে নিম্নআয়ের মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে জীবনযাপন কোনোভাবে সম্ভব হলেও বর্ষায় তা হয়ে ওঠে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে থানচি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বান্দরবান পৌরসভার ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, বনরূপাপাড়া, সিদ্দিকনগর ও ক্যাচিংঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। একই অবস্থা রুমা, লামা, আলীকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও রোয়াংছড়ি উপজেলাতেও। অনেক জায়গায় অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করায় ধসের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

কালাঘাটার বাসিন্দা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “বর্ষা এলেই ভয় বেড়ে যায়। পাহাড় কাটার কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।” ইসলামপুরের মো. আসিফ জানান, “শুধু মাইকিং করে সরিয়ে নেওয়া নয়, দরকার স্থায়ী পুনর্বাসন।”

প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত মাইকিং করছে এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখছে। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, জমির সংকট এবং সচেতনতার অভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, “বর্ষায় মাটি নরম থাকায় অবৈধ পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়ে। প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে, তবে স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য বৃহত্তর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী অং চ মং মারমা বলেন, “প্রতিবছর পাহাড়ধসে হতাহত হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান হচ্ছে না। এটি বড় মানবিক সংকট।”

বন্যা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় লামা–আলীকদম সড়কের রেপারপাড়া ও শিবাতলী এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। প্রশাসন প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত না করার জন্য সতর্কতা জারি করেছে।

মানবিক সংকটের মুখে পাহাড়ি জনপদ

পাহাড়ধস কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দারিদ্র্য, জমির সংকট ও অপরিকল্পিত বসতি গড়ার ফল। প্রতি বছর প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটলেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে হাজারো মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং অবৈধ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

বান্দরবানের পাহাড়ি মানুষের এই নীরব আর্তনাদ এখন রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ দাবি করছে।