ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট নিয়ে আজ সংসদে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব, রাজস্ব আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ

টুইট ডেস্ক: দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে এর সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম বাজেট।

উন্নয়ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা ও প্রকল্প ঋণ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি এবং প্রণোদনা বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হতে পারে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড লক্ষ্য

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই রয়েছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সংস্থাটিকে একাই ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে।

রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘাটতি দুই লাখ ৫০ হাজার কোটির কাছাকাছি

প্রস্তাবিত বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকিং খাতের তারল্যের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম

নতুন বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের ফলে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি আমদানিকৃত কাজুবাদাম, হিমায়িত মাছ, বিদেশি প্রসাধনী এবং বিলাসপণ্যের ওপরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্মাণ খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এমএস রডের উৎপাদন পর্যায়ে কর বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণ ব্যয়ও বাড়তে পারে।

কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম

দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ দিতে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের উৎপাদন পর্যায়ের কর কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মোবাইল ফোন ও বহনযোগ্য কম্পিউটার শিল্পের জন্য বিদ্যমান কর সুবিধাও বহাল রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ের উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ

এবারের বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা।

প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী দুই করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। পরবর্তী ধাপে তা ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে।

নারী, প্রবীণ, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী নাগরিক এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কর নীতিমালা কর ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করবে। তবে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল ঘাটতির বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।