চার দিনে বিচার শেষ, নজির গড়ল রামিসা হত্যা মামলা

রায় ৭ জুন: রামিসা হত্যা মামলায় প্রধান আসামির ফাঁসি দাবি রাষ্ট্রপক্ষের, চার কার্যদিবসেই শেষ বিচার।

নিজস্ব প্রতিনিধি:।রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। একই সঙ্গে চার কার্যদিবসের মধ্যেই বিচারকাজ সম্পন্ন করে নজির স্থাপন করেছে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল।

বৃহস্পতিবার (৪জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী রোববার (৭ জুন) দিন ধার্য করেন।

এর আগে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে কারাগার থেকে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের কাঠগড়ায় তোলা হয় এবং পৌনে ১২টায় বিচারক এজলাসে উঠলে আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু লিখিত ও মৌখিক যুক্তিতর্কে আদালতকে জানান, মামলার প্রত্যেক সাক্ষী রামিসার গলাকাটা মরদেহ দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তার দাবি, সোহেল রানা শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন এবং পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। এ কাজে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, জেরা এবং অন্যান্য প্রমাণে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।

শুনানিকালে আলোচিত আরেক ব্যক্তি ‘ডলার’-এর নাম প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, সোহেল রানা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ডলারের নাম উল্লেখ করেননি। কারাগারে অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে থাকার সময় বিভিন্ন পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি পরে এ নাম বলেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের ধারণা। তবে রাষ্ট্রপক্ষ একই সঙ্গে উল্লেখ করে যে, সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

স্বপ্না খাতুনের সম্পৃক্ততা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও শিশুটির অবস্থা দেখে বাইরে এসে কাউকে জানাননি কিংবা সাহায্য চাননি। বরং সোহেল রানাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন এবং পুরো ঘটনার সময় সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, তিনি চাইলে অপরাধ প্রতিরোধ বা প্রকাশ করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি।

বেলা দেড়টা পর্যন্ত একটানা রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক চলে। পরে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ বেলা ১টা ৩১ মিনিটে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন।
আসামিপক্ষ আদালতে দাবি করে, মূলত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। যে ছুরি দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তার ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। তাই কেবল এ ধরনের প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত নয়।

সোহেল রানার পক্ষে আইনজীবী আদালতকে জানান, ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন এবং পরে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করা হয়।

অন্যদিকে স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই দাবি করে তার বিরুদ্ধে শুধু মরদেহ গোপন বা গুমের অভিযোগ বিবেচনায় দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাত বছরের সাজা চাওয়া হয়। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত মামলার রায়ের দিন নির্ধারণ করেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়া

গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ ১৭ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন। পরদিন ২ জুন টানা ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

সেদিন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তারসহ বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ উঠে আসে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল তা সমাপ্ত ঘোষণা করে।

একই মামলায় ১ জুন সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা এবং মরদেহ গুমের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
এর আগে ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেদিনই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নেন।

যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রামিসা আক্তার রাজধানীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।
গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হলে স্বপ্না খাতুন কৌশলে তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসা স্কুলে না পৌঁছানোয় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তারা। বারবার ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান।

সেখানে উপস্থিত স্বপ্না খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে এবং পরে গলা কেটে হত্যা করে।
ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। প্রথমে স্বপ্না খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরদিন ২০ মে সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। একই দিন স্বপ্না খাতুনকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

রামিসা হত্যা মামলা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলোর একটি। ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং রায়ের তারিখ নির্ধারণ—সব মিলিয়ে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় এটি বিচারিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

এখন নজর ৭ জুনের রায়ের দিকে, যেখানে আদালত দুই আসামির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।