মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

খুলতে পারে দুই বছর বন্ধ থাকা শ্রমবাজার, আসতে পারে বড় ঘোষণা

টুইট ডেস্ক: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে শিগগিরই কুয়ালালামপুর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি কিংবা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের সম্ভাব্য সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন তার চীন সফরেরও প্রাথমিক সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে। তবে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি বেইজিং সফর হবে নাকি ঢাকা হয়ে যাওয়া হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সফরকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরের আলোচ্যসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অভিবাসন ও শ্রমবাজার। প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সমঝোতা হতে পারে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও সম্প্রতি শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “শ্রমবাজার খুলে যাবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন কিংবা এক মাসের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”

তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে পুরোনো সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর আশঙ্কা, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অপরিবর্তিত থাকলে আগের বিতর্কিত সিন্ডিকেট পদ্ধতি পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “সমঝোতা স্মারকের দুর্বল দিকগুলো সংশোধন না হলে আবারও সীমিত কিছু এজেন্সি পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

এদিকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “আমি মন্ত্রী থাকলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কোনো সিন্ডিকেট চলবে না। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স।”

২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশি কর্মীদের নতুন করে প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করে। এর আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদিত কর্মীদের দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে নতুন কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিকবার আলোচনা হলেও বাজারটি আর চালু হয়নি।

মালয়েশিয়া সরকার পরে কর্মী পাঠানোর জন্য ১০টি শর্ত নির্ধারণ করে বাংলাদেশকে যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দিতে বলে। এর মধ্যে ছিল—গত পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং স্থায়ী অফিস সুবিধা। পরে বাংলাদেশ কয়েকটি শর্ত শিথিলের অনুরোধ জানায়।

বর্তমানে লাইসেন্সধারী প্রায় আড়াই হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে ৪২৩টির তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “শ্রমবাজার খোলা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তা যেন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হয়। অতীতের ভুলগুলো পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামো তৈরি না করলে আবারও একই সংকট তৈরি হতে পারে।”

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে যান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, হালাল শিল্প, উচ্চশিক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।