আদ্-দ্বীনের অবহেলায় ঝরল ৬ নবজাতকের প্রাণ

তদন্তে অক্সিজেনস্বল্পতা ও বিধিবহির্ভূত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ইঙ্গিত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা।
টুইট প্রতিবেদক: রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রসব-পরবর্তী ওয়ার্ডে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে স্থাপিত স্প্লিট শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের অভাবই মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনার চার দিন পরও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত না হলেও তদন্তকারীদের ধারণা, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে অক্সিজেনের ঘাটতি অথবা ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি নবজাতকদের জন্য প্রাণঘাতী পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে।
কী ঘটেছিল সেই রাতে
গত ২৭ মে রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার প্রসব-পরবর্তী ওয়ার্ডে ১১ জন প্রসূতি ও তাঁদের নবজাতক অবস্থান করছিল। হাসপাতাল ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, কয়েকজন মা শিশুদের ঠান্ডা লাগার অভিযোগ করলে কিছু সময়ের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। পরে পুনরায় চালু করার পর ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
ভোরের দিকে একে একে ছয় নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা ও বমির উপসর্গ দেখা দেয়। দ্রুত তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হলেও সকাল ৯টার আগেই ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিনের মধ্যে।
তদন্তে উঠে আসছে গুরুতর অনিয়ম
তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে স্প্লিট শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ড, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র কিংবা নবজাতক পরিচর্যা ইউনিটের মতো সংবেদনশীল স্থানে বাইরের বিশুদ্ধ বাতাস প্রবাহের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কক্ষে সেই ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কোনো ধরনের গ্যাস নির্গমন বা বায়ুদূষণ ঘটলে তা দ্রুত প্রাণঘাতী অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।
তদন্তকারী দলের কাছে এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামতকারী কর্মী গ্যাস লিকেজের তথ্যও দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
‘সম্পূর্ণ দায় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেছেন, এই মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তাঁর মতে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের গ্যাস নির্গমন কিংবা পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাবে অক্সিজেনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়ে নবজাতকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পুরোনো অবকাঠামো ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল।
হাসপাতালের ভেতরে রুটির কারখানা!
ঘটনার তদন্তে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী একটি তলায় বৈদ্যুতিক চুলাভিত্তিক রুটির কারখানার অস্তিত্ব খুঁজে পান।
মন্ত্রী জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের কারখানা পরিচালনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কারখানা থেকে কোনো গ্যাস, ধোঁয়া বা রাসায়নিক উপাদান নির্গত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানির বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
শোকের ছায়া পরিবারগুলোতে
যে পরিবারগুলো কয়েক ঘণ্টা আগেও নবজাতকের আগমনে আনন্দে ভাসছিল, তাদের ঘরে এখন শুধুই কান্না। মুন্সিগঞ্জের মীম, নাজমা বেগম, ফারিহা, জান্নাত ও ফাহিমাদের পরিবার মুহূর্তেই হারিয়েছে তাদের স্বপ্ন।
নাজমা বেগম একসঙ্গে হারিয়েছেন যমজ সন্তান। আরেক স্বজন জানান, আগের রাতেও শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সময়মতো প্রকৃত তথ্য জানায়নি এবং ঘটনার পরও স্বচ্ছতা দেখায়নি।
মামলা, জরিমানা ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি
ঘটনার পর এক নবজাতকের বাবা রমনা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এর মধ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী ২ লাখ এবং ভোক্তা অধিকার আইনে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
একই সঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে আইনি নোটিশও পাঠানো হয়েছে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন ৩ জুন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ করেছে। আগামী ৩ জুন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ থাকবে।
স্বজনদের প্রত্যাশা, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে দেশের কোনো হাসপাতালে আর এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।






