ট্রাম্পের ‘দ্রুত যুদ্ধ’ এখন দীর্ঘ কৌশলগত সংকটে

টুইট প্রতিবেদক: ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হবে।
কিন্তু তিন মাস পর এসে প্রশ্ন উঠছে,এই যুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হচ্ছে?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরান এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারায়নি।
বরং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালি এখনও ইরানের চাপের অস্ত্র
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অন্যতম বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে স্টেইট অফ হরমুজ। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের প্রভাব এখনও কার্যকর রয়েছে। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ানোর সক্ষমতা তেহরান ধরে রেখেছে।
একই সঙ্গে ইসরাইল ও উপসাগরীয় কয়েকটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে ইরান দেখিয়েছে, সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরও তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়নি।
ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল—
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা,
আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব দুর্বল করা,
এবং তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, এখন পর্যন্ত এসব লক্ষ্য পূরণের সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ দেখা যাচ্ছে না।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এ্যারন ডেভিড মিলার মন্তব্য করেছেন, স্বল্পমেয়াদি সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দিতে গিয়ে ট্রাম্প এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সংকটে পড়েছেন।
পারমাণবিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে
মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পরও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথান পানিকফ মনে করেন, এই যুদ্ধ উল্টো ইরানকে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে আরও আগ্রহী করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার কৌশল নিতে পারে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জনঅসন্তোষ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরেও আগের মতো একক সমর্থন আর দৃশ্যমান নয়। যুদ্ধের ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে দলটির ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে।
ইউরোপ দূরে, নজর রাখছে চীন-রাশিয়া
ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সত্ত্বেও অনেক ইউরোপীয় দেশ সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
একই সময়ে চায়না ও রাশিয়া ইরানের অসম যুদ্ধকৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পপন্থীদের পাল্টা যুক্তি
তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা দাবি করছেন, ইরানের সামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত হানা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা আলেকজান্ডার গ্রে বলেছেন, এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের দিকে ঝুঁকছে এবং কিছুটা হলেও চীনের প্রভাব থেকে দূরে সরে আসছে।
অনিশ্চিত সমাপ্তির দিকে যুদ্ধ
সব মিলিয়ে সামরিক শক্তির প্রদর্শন সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে যুদ্ধের স্পষ্ট সমাপ্তি, কূটনৈতিক সমাধান কিংবা রাজনৈতিক বিজয়,কোনোটিই নিশ্চিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ভবিষ্যতে আরও বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।






