ব্রিটেনে প্রতিবাদ দমনে কঠোরতা

জলবায়ু ও ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ঘিরে বাড়ছে ‘রাজনৈতিক বন্দী’ বিতর্ক।
টুইট প্রতিবেদক: যুক্তরাজ্যে জলবায়ু সংকট ও গাজা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় কঠোরতা নতুন ধরনের “রাজনৈতিক বন্দী” তৈরির দিকে যাচ্ছে,এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদন। গবেষকরা বলছেন, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, দীর্ঘ রিমান্ড এবং কঠোর আইন প্রয়োগ এখন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন এবং আন্দোলনপন্থী সংগঠন ডিফন্ড আওয়ার জুরিস–এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে সরাসরি আন্দোলন বা নাগরিক আইন অমান্যের ঘটনায় কারাদণ্ড ছিল তুলনামূলক বিরল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটিশ আদালত ও প্রশাসন এসব ক্ষেত্রে ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিতব্য ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিক্ষোভবিরোধী নতুন আইন, পুলিশের বাড়তি ক্ষমতা, করপোরেট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা এবং আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণায় জলবায়ু আন্দোলন ও ফিলিস্তিনপন্থী কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৮৬টি কারাবন্দিত্বের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৩৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি প্রতিবেদনের।
যেসব ২৫৬টি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেছে, সেখানে গড় সাজা ছিল ২৮ সপ্তাহ। প্রতি তিনজনের একজনকে ছয় মাস বা তার বেশি এবং প্রতি পাঁচজনের একজনকে এক বছরেরও বেশি সময় কারাভোগ করতে হয়েছে।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও জলবায়ু ন্যায়বিচার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড হোয়াইট বলেন,
“এগুলো ব্যতিক্রমধর্মী শাস্তি, যা মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কঠোর সাজা ও দীর্ঘ রিমান্ডের মাধ্যমে এমন এক শ্রেণির বন্দী তৈরি করা হচ্ছে, যারা প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও নাগরিক অবাধ্যতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
রিমান্ডকে ‘প্রথম আঘাত’ বলছেন গবেষকরা
প্রতিবেদনে রিমান্ড ব্যবস্থাকে আন্দোলন দমনের “প্রথম ধাপ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচারপূর্ব হেফাজতে কাটানো সময়ই শেষ পর্যন্ত ঘোষিত সাজাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে “ফিলটন ২৪” মামলা। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন এ্যাকশন–এর কর্মীরা ব্রিস্টলের কাছে ইসরাইলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিট সিষ্টেমস–সংশ্লিষ্ট একটি কারখানায় বিক্ষোভে অংশ নেন। অভিযুক্তদের কয়েকজনকে ১৮ মাস পর্যন্ত কারাগারে রাখা হয়, যদিও সাধারণত বিচারের আগের হেফাজতকাল ছয় মাসের মধ্যে সীমিত থাকে।
পরবর্তীতে প্রথম ছয় আসামির মধ্যে কয়েকজন গুরুতর চুরি ও সম্পত্তি ক্ষতির অভিযোগ থেকে খালাস পান।
দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা থেকেই ফৌজদারি সাজা
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জুরি বিচার ছাড়াই দেওয়া কারাদণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশই আদালত অবমাননার অভিযোগে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিচারকের নির্দেশ অমান্য করা বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আরোপিত দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
অধ্যাপক ডেভিড হোয়াইট সতর্ক করে বলেন, দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞাকে ধীরে ধীরে ফৌজদারি অপরাধে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যত এমন ক্ষমতা পাচ্ছে, যা মানুষের কারাবাসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালে জষ্ট ষ্টপ অয়েল আন্দোলনের পর ওয়ারউইকশায়ার ব্যুরো কাউন্সিল হাইকোর্ট থেকে একটি নিষেধাজ্ঞা আদায় করে। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে ৬৯ জন আন্দোলনকারীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন শুধু প্ল্যাকার্ড বহনের কারণেও দণ্ডিত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ নাকচ বিচার বিভাগের
তবে ব্রিটিশ বিচার বিভাগ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিচার বিভাগীয় মুখপাত্র বলেন, বিচারিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা যুক্তরাজ্যের আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি। বিচারকরা প্রমাণ, যুক্তি এবং প্রচলিত আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দেন। পাশাপাশি সংসদ প্রণীত আইন ও স্বাধীন দণ্ডবিধি পরিষদের নির্দেশনা অনুসরণ করেই সাজা নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু আন্দোলন, গাজা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রশ্নকে ঘিরে যুক্তরাজ্যে নাগরিক স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, প্রতিবাদ দমনে অতিরিক্ত কঠোরতা গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করতে পারে।






