বোরো বিপর্যয়ে চালের বাজারে নতুন শঙ্কা

হাওরাঞ্চলের অকালবন্যায় ধানহানি, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
টুইট প্রতিবেদক: দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের উৎপাদনে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও উজানের ঢলে হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষক, কৃষি বিভাগ ও খাদ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে, এই বিপর্যয়ের প্রভাব আগামী মাসগুলোতে চালের বাজারে চাপ বাড়াতে পারে।
কৃষকদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় এবার অর্ধেকেরও কম ধান ঘরে উঠেছে।
কোথাও কোথাও যে জমিতে আড়াই হাজার টন ধান উৎপাদিত হয়েছিল, সেখানে এবার ফলন নেমে এসেছে ৯০০ থেকে এক হাজার টনে। শুধু উৎপাদন কমেনি, উদ্ধার করা ধানের মান নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
বাংলাদেশের মোট চালের চাহিদার সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। সরকারি হিসাবে দেশের মোট চালের প্রায় ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। আমন থেকে আসে ৩৯ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং আউশ থেকে প্রায় আট শতাংশ।
সরকারি হিসাব বনাম মাঠের বাস্তবতা
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ক্ষতির পরিমাণ অতটা ভয়াবহ নয়। তাদের মতে, মোট উৎপাদনের ১০ থেকে ১২ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় আগাম ধান কাটা সম্ভব হয়নি, সেখানে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু জাফর আল মুনছুর জানিয়েছেন, চলতি বছরে মোট ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার কোটি ৪১ লাখ টন।
এর মধ্যে বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা দুই কোটি ২৭ লাখ টন।
তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা গেলে সরকারি মজুত আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
সংগ্রহে ধীরগতি, বাজারে অস্বস্তি
খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি মজুত বাড়াতে ১৯ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল, এক লাখ টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন গম কেনার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বাস্তব অগ্রগতি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। গত ১৮ মে পর্যন্ত সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৮ হাজার ৬৭৯ টন এবং আতপ চাল ৫০৩ টন। ধান সংগ্রহ হয়েছে তিন হাজার ৬৫০ টন। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহ কার্যক্রম অনেক পিছিয়ে রয়েছে।বর্তমানে সরকারি খাদ্য মজুত রয়েছে ১৭ লাখ এক হাজার ৯৭৫ টন।
হাওরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের হাওরাঞ্চল দেশের বোরো উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জকে দেশের ‘ধানের ভাণ্ডার’ বলা হয়। এবার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে এসব এলাকাতেই।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কৃষক জুলহাস উদ্দিন জানান, তিনি নিজস্ব ও বর্গা মিলিয়ে ৫০ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। গত বছর যেখানে ১৮ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল, এবার সেখানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর কৃষক হাজী আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া বলেন, গত বছর ৩৫ একর জমিতে প্রায় তিন হাজার মণ ধান পেয়েছিলেন। এবার পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় উৎপাদন দুই হাজার মণ কমে গেছে।
আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, উৎপাদনে কয়েক লাখ টনের ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে আবারও চাল আমদানির দিকে যেতে হতে পারে। অতীতে ভারত, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, দেশের তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকট না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে চালের বাজারে চাপ বাড়বে। কারণ বোরো মৌসুমের চাল দিয়েই দেশের ছয় থেকে সাত মাসের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল থাকলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে হাওরের কৃষি
খাদ্য পরিকল্পনা ও তদারকি ইউনিটের পরিচালক মোস্তফা ফারুক আল বান্না বলেছেন, ধান উৎপাদনের অফ-সিজনে অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থির করার চেষ্টা করে। তখন সরকার ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও আমদানির অনুমোদনের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এখন প্রায় নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বন্যা-সহনশীল ধানের জাত, কৃষি বিমা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত ফসল কাটার অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
তাদের মতে, কৃষককে টিকিয়ে রাখতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষিনীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।






