সুদহার বিতর্কে বিভক্ত বাংলাদেশ ব্যাংক

বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির সমীকরণে নীতিনির্ধারকদের ভিন্ন অবস্থান।

টুইট প্রতিবেদক: দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ সুদহারের প্রভাব, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ,এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আগামী মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার কমানো হবে কি না, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত সামনে এসেছে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেন সব ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকরা।

বৈঠকে একাংশের কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমান উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ব্যবসা খাতকে তুলনামূলক কম সুদের সুবিধা দিতে হবে।

তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তবে বৈঠকে বিপরীত মতও উঠে আসে। কয়েকজন কর্মকর্তা ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালু থাকা নয়-ছয় সুদহার ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তখন তুলনামূলক কম সুদহার থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। তাদের মতে, কেবল সুদহার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে,এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জাকির হোসেন চৌধুরী বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ ঋণনির্ভর ভোগব্যবস্থায় অভ্যস্ত নয়।

ফলে সুদহার বাড়া বা কমার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সরাসরি সম্পর্ক সবসময় কার্যকর হয় না। তিনি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কৃষি উৎপাদনের ওঠানামাকে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে ড. মো. কবির আহাম্মদ মন্তব্য করেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব বর্তমান বাস্তবতায় সবসময় কার্যকর হচ্ছে না। তাই মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচক বিবেচনায় নিতে হবে।

বৈঠকে ব্যাংক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে আসে। কর্মকর্তারা জানান, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে গ্রাহকেরা তুলনামূলক ভালো ব্যাংকে অর্থ রাখছেন। এতে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারলেও ঋণ বিতরণে উচ্চ সুদহার বজায় রাখছে। ফলে তাদের সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বর্তমান মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অর্জিত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে একটি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন এক জটিল নীতিগত ভারসাম্যের মুখোমুখি। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা,এই দুইয়ের সমন্বয় করাই হবে আগামী মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।