ফুটবল থেকে যুদ্ধ

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের উত্তাপ কীভাবে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছিল এল সালভাদর-হন্ডুরাসে।

টুইট ডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু গোল, জয়–পরাজয় কিংবা ট্রফির গল্প নয়। এর আড়ালেও লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, রাজনীতি, আবেগ আর কখনো কখনো ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ১৯৬৯ সালের তথাকথিত ‘ফুটবল যুদ্ধ’আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্বকাপ ঘিরে পুরোনো স্মৃতিচারণায়।

মধ্য আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশ এল সালভাদর ও হন্ডুরাসের মধ্যে এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে। তবে ফুটবল ছিল কেবল আগুনে ঘি ঢালার কাজ। মূল বিরোধ ছিল অভিবাসন, ভূমি সংকট ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ঘিরে।

সে সময় লাখো সালভাদরিয়ান জীবিকার সন্ধানে হন্ডুরাসে বসবাস করছিলেন। হন্ডুরাস সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনায় পৌঁছে যায়।

এই পরিস্থিতিতেই বিশ্বকাপ বাছাইয়ে মুখোমুখি হয় দুই দেশ। প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগালপায়। ম্যাচের আগের রাতে সালভাদর দলের হোটেলের সামনে জড়ো হয়ে সারারাত চিৎকার, গাড়ির হর্ন আর পাথর ছুড়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন হন্ডুরাসের সমর্থকেরা। পরদিন ক্লান্ত সালভাদর ১-০ গোলে হেরে যায়।

শেষ মুহূর্তের সেই গোল মেনে নিতে না পেরে অ্যামেলিয়া বোলানোস নামের এক তরুণী আত্মহত্যা করেন,যা পরবর্তীতে জাতীয় আবেগে রূপ নেয়।

এক সপ্তাহ পর ফিরতি ম্যাচে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে এল সালভাদরে। হন্ডুরাস দলকে ঘিরে ভয়াবহ বৈরী পরিবেশ তৈরি করা হয়। পচা ডিম, মরা ইঁদুর ছোড়া থেকে শুরু করে সাঁজোয়া গাড়িতে করে দলকে মাঠে নিতে হয়।

ম্যাচ ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানিও ঘটে। সেই ম্যাচে ৩-০ গোলে জয় পায় এল সালভাদর।

দুই দল একটি করে ম্যাচ জেতায় নিরপেক্ষ ভেন্যু মেক্সিকো সিটিতে তৃতীয় ম্যাচ আয়োজন করা হয়। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে ৩-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে এল সালভাদর। কিন্তু মাঠের উত্তেজনা আর সীমাবদ্ধ থাকেনি ফুটবলে।

মাত্র ১৮ দিনের মাথায় দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় সামরিক সংঘর্ষ। ইতিহাসে যা পরিচিত হয়ে যায় ‘ফুটবল যুদ্ধ’ নামে।

বিমান হামলা, সীমান্ত সংঘর্ষ ও ব্যাপক সহিংসতায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল প্রায় এক শ ঘণ্টা, কিন্তু এর ক্ষত রয়ে যায় বহু বছর।

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এই ঘটনা এখনো এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়,খেলার আবেগ যখন রাজনৈতিক বিদ্বেষের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কখনো কখনো পুরো অঞ্চলকে ঠেলে দেয় রক্তাক্ত সংঘাতের দিকে।