উন্নয়ন নয় অপচয়?

প্রাক-বাজেট আলোচনায় মেগা প্রকল্প ও অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা

টুইট প্রতিবেদক: রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত না করে শুধুমাত্র বড় প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারকে কর্মসংস্থান, কৃষি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বাস্তবভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের নামে বহু ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও তার অনেকগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন, কর্ণফুলি টানেল নির্মাণ এবং গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “এগুলো উন্নয়নের বাস্তব চিত্র নয়, বরং উন্নয়নের ফাঁদ।”

তিনি আরও বলেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাজনৈতিক প্রচারের পরিবর্তে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে সেখান থেকে রাষ্ট্র কী পরিমাণ প্রত্যাবর্তন পাবে, তা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাজেটের আকার নয়, গুণগত মানে জোর

আলোচনায় মাহমুদুর রহমান বলেন, বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার বাড়ানোকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কিছু নয়। বরং উন্নয়ন ব্যয়ের অপচয় ও দুর্নীতির পথ বন্ধ করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

তার ভাষায়, সক্ষমতার বাইরে উন্নয়ন প্রকল্প বাড়ানো হলে ‘লিকেজ’ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের অর্থ অপচয় হবে।

মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ

আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; প্রয়োজন উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতি।

তিনি শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি চাকরি বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষা খাতে দ্রুত সংস্কার এনে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি।

বৈষম্যের অর্থনীতি

দেশে সম্পদের বৈষম্য আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, উচ্চবিত্ত ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের প্রায় অর্ধেক সম্পদ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ন্যূনতম সম্পদ থেকেও বঞ্চিত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে না।

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারের ঋণ বাড়ছে, রপ্তানি আয় কমছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উচ্চ সুদ ও কর ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে সংকুচিত করছে।

তিনি আরও বলেন, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি হলেও গ্যাস সংকটের কারণে বহু কলকারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।