ক্রসফায়ার বিতর্কে আইজিপির পাশে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

আইজিপির বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ আখ্যা দিয়ে প্রচলিত আইন মেনে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সংগঠনটি; তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত।

টুইট প্রতিবেদক: ক্রসফায়ার নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বিতর্কিত বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। সংগঠনটি আইজিপির বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা জরুরি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের পেশাগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আইনের সীমার মধ্যে দায়িত্ব পালনের আহ্বান
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই বাংলাদেশ পুলিশ তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ আইন এবং পুলিশ বিধিমালায় পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট কাঠামো রয়েছে।

সংগঠনটির মতে, এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও জল জবাবদিহি নিশ্চিত করাও পুলিশের দায়িত্ব। আইনানুগ কঠোরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। পুলিশ সদস্যরা আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬ হামলা

পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

বিপিএসএর ভাষ্য, এ পরিসংখ্যান পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। সংগঠনটি এমন কর্মপরিবেশের ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে পুলিশ সদস্যরা আইনগত আত্মরক্ষার অধিকারসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

সংগঠনটির মতে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অপরিহার্য। একই সঙ্গে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মানবিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

কী বলেছিলেন আইজিপি
এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, তাহলে আমরা সেটাই করব।’
আইজিপির এ বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রতিবাদ জানায়। বক্তব্যটি নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের আইনি সীমা এবং পুলিশের ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। সংগঠনটি আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে ব্যাখ্যা করে জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগের কথা বলার পাশাপাশি প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনি সীমা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জননিরাপত্তা রক্ষা ও অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা এবং নাগরিকের জীবন ও অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এ বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়।