স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি নাহিদের

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দায়ে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ চান এনসিপি আহ্বায়ক; ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ঘোষণা
টুইট ডেস্ক: বর্তমান সরকারকে ‘গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও জ্বালানিমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে দুই মন্ত্রীকে সরিয়ে মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠন এবং জনগণের অধিকার আদায়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ কর্মসূচি সামনে রেখে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম শুরুর আগে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণে সরকারকে অগণতান্ত্রিক বলেও অভিহিত করা যায়। তাঁর ভাষ্য, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ছাড়া জনগণের অধিকার আদায় সম্ভব নয়।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে উদ্বেগ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ থেকে ২১০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শুকনো মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ডিম প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে গিয়ে মানুষ প্রয়োজনীয় সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে কিনতে পারছেন না। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদাও কমাতে হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পণ্যের দাম বাড়েনি বা বাড়বে না—সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তাঁরা সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক তথ্য দিয়েছেন।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ
জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, নির্বাচনের পর এলপিজি গ্যাসের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে ছিল। বর্তমানে সরকারি হিসাবে দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং বেসরকারি বাজারে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। এ ছাড়া সরকার তিন দফায় অকটেন ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ যত দিন চলবে, তত দিন কি জ্বালানির দাম এভাবেই বেশি থাকবে? তাঁর অভিযোগ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা নেই।
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে তিনি সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তাঁর দাবি, সংবিধান পরিবর্তনের নামে জনগণের অধিকার হরণের চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার নেই।
জ্বালানিমন্ত্রীর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাত মাসেও জ্বালানি খাতের সংকট কাটাতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। এ কারণে জ্বালানিমন্ত্রীরও দায়িত্বে থাকার অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এর আগে তথ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েক দিন আগে একজন প্রতিমন্ত্রীকেও দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ খাতে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। তিনি দুই মন্ত্রীকে সরিয়ে মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানান।
সংবিধান সংস্কার ও আইন বাতিলের দাবি
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রহসন করার জন্য একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। এ কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে নতুন সংস্কারকৃত সংবিধান প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক।
সাইবার আইনসহ কর্তৃত্ববাদী হিসেবে অভিহিত বিভিন্ন আইন বাতিলের দাবিও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, সাইবার আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী সংসদে পাস হতে দেওয়া হবে না। গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের মতো যেসব আইনকে তাঁরা কর্তৃত্ববাদী বলে মনে করেন, সেগুলোও বাতিল করতে হবে।
এ ছাড়া জুলাই গণহত্যা এবং গুম-খুনের বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও ৫ আগস্ট উত্থাপিত দাবিগুলোর বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন স্থানে জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
আগামী ৩০ অক্টোবর দুপুর ৩টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম। এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি জনগণের অধিকার আদায়ের কর্মসূচি।
তিনি জানান, ঢাকায় কর্মসূচি পালনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি।
রাজধানীতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও মাদক সিন্ডিকেটের কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। ঢাকাবাসীকে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গণআন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মেয়রপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মেয়রপ্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।






