কুমিল্লায় নিখোঁজ চার স্কুলছাত্রী উদ্ধার

মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার নিয়ে নিখোঁজের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত আট তরুণের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
টুইট প্রতিবেদক: কুমিল্লায় বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার নিয়ে নিখোঁজ হওয়া চার স্কুলছাত্রীকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের প্রতি আকর্ষণ এবং অনলাইনে পরিচিত কয়েকজন তরুণের সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর আকাঙ্ক্ষা থেকে তারা বাড়ি ছেড়েছিল।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
স্কুলে না যাওয়ায় সামনে আসে নিখোঁজের ঘটনা
পুলিশ জানায়, গত ১২ অক্টোবর সকালে কুমিল্লা নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রী স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। তবে তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকেরা পুলিশকে অবহিত করেন।
এ ঘটনায় পৃথক চারটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলে পুলিশ তাদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বেতার বার্তা পাঠানো হয়।
সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়ার পর স্কুলছাত্রী তাজমিনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে থাকায় নিখোঁজ চার শিশুকে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পুলিশ জানায়, তাদের নিরাপদে উদ্ধারে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। পরে সোমবার গভীর রাতে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহযোগিতায় চারজনকে উদ্ধার করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, বাড়ি ছাড়ার পরিকল্পনা
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, উদ্ধারের পর মঙ্গলবার চার ছাত্রীকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রীরা নিয়মিত মুঠোফোন ব্যবহার করত এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের পাশাপাশি টিকটকে ভিডিও প্রকাশ করত।
এসব মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আট তরুণের পৃথকভাবে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে তরুণদের প্রকৃত ঠিকানা সম্পর্কে ছাত্রীরা নিশ্চিত ছিল না।
পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কাল্পনিক জীবনযাপনের ধারণায় প্রভাবিত হয়ে তারা স্বাধীনভাবে থাকা, নিজেরা উপার্জন করা এবং অনলাইনে পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করে। এ উদ্দেশ্যে তারা বাড়ি থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যায়।
তবে তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে ওই তরুণদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা বা অন্য কারও ইন্ধন ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মোবাইল বিক্রি করে ঢাকায়, পরে চুনারুঘাটে
পুলিশ সুপার জানান, নিখোঁজ হওয়ার দিন সকালে চার ছাত্রীর একজন কুমিল্লার বাহার মোবাইল মার্কেটে পরিবারের একটি মুঠোফোন চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। বিক্রির টাকা ও সঙ্গে নেওয়া স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা প্রথমে ঢাকায় যায়।
সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী সুবিধা করতে না পেরে তারা চুনারুঘাটে এক ছাত্রীর দাদার বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে বাড়ির সঠিক ঠিকানা নিশ্চিত করতে না পারায় তারা অটোরিকশায় ঘোরাফেরা করছিল। এ সময় পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
পরে উদ্ধার হওয়া ছাত্রীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা নগরীর টাউন হল সুপার মার্কেটের একটি দোকান থেকে বিক্রি করা মুঠোফোনটি জব্দ করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। একই সঙ্গে ছাত্রীদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকারও জব্দ করা হয়।
অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়টি যথাযথভাবে তদারক করা জরুরি।
সম্প্রতি কুমিল্লায় অপ্রতিম ও তাজমিন হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার খবর দ্রুত পাওয়ায় চার শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সময়মতো খবর পেলে তাজমিনকেও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত আট তরুণের সম্পৃক্ততা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এখনো তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ছাত্রীদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে কারও ইন্ধন ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া
উদ্ধার হওয়া চার ছাত্রী বর্তমানে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় রয়েছে। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালতে নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনাটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন পরিচয়ের নিরাপত্তা এবং অভিভাবকদের তদারকির গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।






