ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য: ভারতের ৪ কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

ইরানি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ; ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এ ৬০টির বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।

টুইট ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতের চারটি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কর্মসূচি ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় সোমবার (২৪ আগস্ট) এসব নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা ভারতীয় কোম্পানিগুলো হলো পোর্টিজ পার্টনার্স এলএলপি, সদাশিভা ওভারসিজ লিমিটেড, পিপি সফটটেক প্রাইভেট লিমিটেড এবং প্রাক্রুতিস ইনফ্রা ইমপেক্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইরানি পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য আমদানি, পরিবহন ও বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

চার ভারতীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যমতে, পোর্টিজ পার্টনার্স এলএলপি ভারতের একটি শুল্ক ও বাণিজ্য-সহায়ক প্রতিষ্ঠান, যা ইরানি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের একাধিক চালান ভারতে আমদানিতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার ভারতীয় নাগরিক ইন্দ্রিসমিয়া আশারাফমিয়া শেখ ও হরিশ রামচন্দ্র রাঙ্গিকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

সদাশিভা ওভারসিজ লিমিটেড ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের ইরানি উৎসের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। এর মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বনজোর কমোডিটি এফজেডই-র কাছ থেকেও পণ্য নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে পিপি সফটটেক প্রাইভেট লিমিটেড ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ইরানি উৎসের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করেছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। কোম্পানিটি জ্বালানি তেল, বেস অয়েল ও বিটুমিনসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

প্রাক্রুতিস ইনফ্রা ইমপেক্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড-এর বিরুদ্ধেও ইরানি উৎসের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রকাশিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে।

অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট কী

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করে। এর লক্ষ্য ইরানের তেল পাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য এবং দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে অর্থায়ন করে এমন আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এই অভিযানের মাধ্যমে ইরানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানটি শুধু ইরানের প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তৃতীয় দেশের কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সর্বশেষ এই পদক্ষেপে ৬০টির বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের সামরিক কার্যক্রম, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি, সাইবার কার্যক্রম এবং অবৈধ তেল বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক রয়েছে।

ভারতের জন্য নতুন চাপ

ভারতের চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় দিল্লির জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ভারত ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে।

তবে এবারের মার্কিন পদক্ষেপকে শুধু ভারত-ইরান সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তেলবাজারেও প্রভাব

নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক তেলবাজারে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়নি। বরং ২৪ আগস্ট ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়ায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মার্কিন পদক্ষেপকে ঘিরে ভবিষ্যতে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনার কথাও বিনিয়োগকারীরা বিবেচনায় নিয়েছেন।

তবে ইরানের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ঘিরে ঝুঁকি থাকায় এ নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু ইরান ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন।