ক্ষুধার পেটে ডাকের ঝুলি: শাখা ডাকঘর কর্মচারীদের কান্না শুনবে কে?

অভাবের তাড়নায় রাজপথে ২৩ হাজার শাখা ডাকঘর কর্মচারী, বেতন বৃদ্ধি ও সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে আমরণ লড়াইয়ের ঘোষণা।

বিশেষ প্রতিবেদন: ঝুলিতে হাজারো মানুষের সুখ-দুঃখের চিঠি, পরমাত্মীয়ের পাঠানো টাকার মানিঅর্ডার কিংবা জরুরি দাপ্তরিক কাগজপত্র। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে মানুষগুলো মাইলের পর মাইল হেঁটে মানুষের দ্বারে দ্বারে খুশির বার্তা পৌঁছে দেন, আজ তাদের নিজেদের ঘরেই শুধুই কান্নার সুর।

জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়ের এই বাজারে দেশের প্রায় ২৩ হাজার শাখা ডাকঘর কর্মচারী আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপান্তেও এসে দাঁড়িয়েছেন।

​গত সোমবার থেকে রাজশাহীসহ স‌ারা‌দে‌শের শাখা ডাকঘর কর্মচারীরা নেমেছেন অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে। তাঁদের চোখে-মুখে আজ আর দায়িত্বের চেনা হাসি নেই, আছে অধিকার আদায়ের বুকভাঙা আকুতি।

অভাবের সংসারে উৎসবের আলো নেই

​বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে শাখা ডাকঘরের কর্মচারীরা যে যসামান্য বেতন-ভাতা পান, তা দিয়ে সংসার চালানো তো দূরের কথা, দুবেলা ডাল-ভাত জোগাড় করাই এক দুঃসহ সংগ্রাম। একজন আন্দোলনকারী কর্মচারী অত্যন্ত ক্ষোভ আর দুঃখ নিয়ে বলেন:

​”আমরা মানুষের খুশির খবর বয়ে নিয়ে যাই, অথচ মাস শেষে আমাদের ঘরে উনুন জ্বলে না। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ—সবকিছু যেন এখন এক অলীক বিলাসিতা।”

​বর্তমান বেতন দিয়ে এই চরম মূল্যস্ফীতির বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা বেতন-ভাতা তিনগুণ বৃদ্ধি এবং বিভাগীয় কর্মচারী হিসেবে সরকারি স্বীকৃতির মতো যৌক্তিক দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন।

অচল ডাকসেবা, তবুও চলছে নাড়ির লড়াই

​ধর্মঘটের কারণে দে‌শের বিভিন্ন শাখা ডাকঘরের সাধারণ মানুষের চিঠি ও পার্সেল আদান-প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তিতে পড়লেও তারা কর্মচারীদের এই মানবিক দাবির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। কারণ, মানুষ দেখছে যে টেকনোলজির যুগেও মাঠপর্যায়ের এই ডাককর্মীরা কতটা অবহেলিত।

​বাংলাদেশ ডাক কর্মচারী ইউনিয়ন ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যানারে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। স্মারকলিপি দেওয়ার সময় কর্মচারীদের চোখগুলো যেন বলছিল—’আমাদের বাঁচতে দিন।’

আর কত অপেক্ষা?

​দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই প্রান্তিক কর্মচারীরা। তবে তারা আন্দোলনের চেয়েও বেশি চান রাষ্ট্রের একটু সহানুভূতি। যে মানুষগুলো সারা জীবন দেশের ডাক বিভাগকে সচল রাখতে নিজেদের যৌবন ও শ্রম বিলিয়ে দিলেন, আজ জীবনের শেষ বেলায় এসে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই এখন দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা।

​ঘরমুখী মানুষের ডাক পৌঁছানো এই মানুষগুলোর মনের ডাক কি এবার পৌঁছাবে নীতি-নির্ধারকদের কানে?